২৪ জুলাইয়ের স্মৃতিকথা:
আলহামদুলিল্লাহ। আজ সেই ভয়াল ২৪ শে জুলাই। ২০২৪ সালের ২৪ শে জুলাই বৈষম্য বিরোধী আন্দোলনকে আরো বেগবান করার জন্য সবাইকে নিয়ে ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন সমন্বয় করতে ছিলাম। প্রতিনিয়ত যোগাযোগ রক্ষা করে চলছিলাম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইদের সাথে। যোগাযোগ চলছিল আমার প্রিয় ক্যাম্পাস জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান এবং সাবেক ভাইদের সাথে। তাদের জন্য জামালপুরে বসেই চলছিল সব ধরনের সহযোগিতা। পানি থেকে খাবার, ঔষধ, মোবাইলে এমবি সরবরাহ। আর সব ধরনের লজিস্টিক সাপোর্ট। ২৪ ঘণ্টা ফোনে যোগাযোগ। কয়েক রাত থেকে ঘুমহীন ক্লান্ত শরীর। জামালপুরের ভাই বোনদের সাথে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ এবং সহযোগিতা। ২৪ ঘণ্টা ডিবি, এনএসআই, ডিএসবির নজরদারিতে। ডিএসবির ভাইদের সার্বক্ষণিক ফোন, কোথায় আছি, কোথায় যাচ্ছি। আর আমার ফোনকে ট্যাপিংয়ের আওতায় আনা হয়েছে। কোন এক জায়গায় খাবার এবং পানি পাঠিয়েছি। সেগুলো সব ডিবি পুলিশ নিয়ে নিছে। আমিও তো নাছোড়বান্দা। যত বাধাই আসুক, কাজ আমাকে করতেই হবে। আমার ভাইয়েরা দিনরাত লড়ে যাচ্ছে। তাদের পাশে যদি না থাকতে পারি, এই জীবন বাঁচিয়ে রেখে লাভ কি। চারদিক থেকে শুধু গ্রেফতার, আহত এবং শহীদ হওয়ার খবর পাচ্ছি। আমাদের অনেক ভাইকে তুলে নিয়ে যাচ্ছে পুলিশ। আমার বড় ভাই বাসার ভাই ঢাকার রাজপথে নেতৃত্ব দিচ্ছে। বাসার ভাই বলছে, আন্দোলন সংগ্রামে পিছিয়ে পড়া যাবে না। আমরা মাঠে আছি। তুই আমাদের সাপোর্ট দিয়ে যা। ডঃ রেজাউল করিম ভাইয়ের সাথে সব সময় যোগাযোগ রাখার চেষ্টা কর। ভাই সব সমন্বয় করছে। এভাবেই চলতেছিল আমার আন্দোলনের দিনগুলো। পুলিশের নজরদারি থেকে বাঁচতে বাসায় রাত্রিযাপন বন্ধ করে দিলাম।
আমার মিসেস ডাঃ নাহিদা আক্তার পিংকি খুব সাহসী মানুষ। অনেক আওয়ামী লীগের নেতারা তাকে ফোনে হুমকি দিতে ছিল। আমি যেন জামালপুর ছেড়ে চলে যাই। আমার হাসপাতাল বন্ধ করে দেওয়ার জন্য চলছিল সিভিল সার্জন সাহেবের মাধ্যমে চাপ। এরই মধ্যে একদিন মোবাইল কোর্ট হলো। কোন সমস্যা না পেয়ে চলে গেল।
২৪ তারিখ সারাদিন ব্যস্ত সময় পার করতেছিলাম। রাত ৮টায় আমার চেম্বারে একটি মিটিং করতে ছিলাম আমাদের ভাইদের নিয়ে। সামনে কিভাবে আন্দোলন আরো বেগবান করা যায়। এমন সময় ডিবির ওসি শাহনেওয়াজ ইমন সাহেব আমার চেম্বারে ঢুকে সালাম দিয়ে বললেন, এসপি স্যার আপনাকে সালাম দিছে। আমাদের সাথে যেতে হবে।
আমি এসপি সাহেবকে ফোন দিলাম। উনি আমাকে বললেন, আপনার সাথে জরুরি আলাপ আছে। আমার চেম্বারে আসেন। আমার তখন আর কিছুই বুঝতে বাকি রইল না।
আমি আমার মিসেস ডাঃ পিংকিকে ফোন দিলাম। ফোন ধরেই বললো, আপনাকে নাকি পুলিশ এরেস্ট করেছে। আমি বললাম, তোমাকে কে বললো? সে বলে, টিভির নিউজ চ্যানেলে দেখাচ্ছে, জামালপুরে জামায়াত নেতা মোঃ আশরাফুল ইসলাম বুলবুল গ্রেফতার। টিভিতে দেখে সবাই ফোন দিচ্ছে। আমি নাকি গ্রেফতার।
আমার মিসেস দ্রুত গাড়ি নিয়ে চলে আসলো আমার বুলবুল জেনারেল হাসপাতালের চেম্বারে। তারপর চেম্বার থেকে বের হয়ে দেখি এলাহী কাণ্ড। পুরো হাসপাতাল ঘিরে রেখেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা।
কি আর করার। বাধ্য হয়েই যেতে হলো এসপি অফিসে। এসপি সাহেব বললো, আমি নাকি জামালপুরের মীর কাশেম আলী। আন্দোলনের জন্য নাকি তিন কোটি টাকা দিয়েছি। তাদের কাছে প্রমাণ আছে। তাই আমাকে বাধ্য হয়ে জেলা আওয়ামী লীগের নেতাদের চাপে গ্রেফতার করা হলো।
তারপর জিজ্ঞাসাবাদের জন্য নিয়ে যাওয়া হলো ডিবি অফিসে। রাতভর অমানবিক নির্যাতনের পর পরের দিন বিকাল তিনটায় কোর্টে হাজির করে জেলখানায় প্রেরণ করা হয়। যেখান থেকে মুক্তি মিলে ৩৬ জুলাইয়ের পর।
