Skip to content
প্রকাশ- November 2, 2026 , 16:51 pm
অন্যান্য

কত রং আকাশের…

কত রং আকাশের…
নয়ন আসাদ ।।
দুপুর গড়িয়ে বিকালের রঙ ধরেছে আকাশে।
বালিজুড়ি-মাহমুদপুর সড়ক।
অটোরিকশার খোলা দুই পাশ দিয়ে বাতাস ঢুকছিল, পাওয়া যাচ্ছিল মৃদু জলাবদ্ধ ঘাসের ঘ্রাণ।
অটোরিক্সার বিপরীত সিটে এক তরুণী। কোলে এক শিশু, পাশে আরেকটা। বোঝা যাচ্ছিল ভারী ক্লান্ত। তবু তার চোখ বারবার এসে থামছিল আমার চোখে। আমি অস্বস্তি বোধ করছিলাম। মনে হচ্ছিল, কোথাও যেন দেখেছি। কিন্তু মনে পড়ছে না। হঠাৎ সে বলল,
“স্যার, আমাকে চিনতে পারছেন?”
“স্যার” শুনে আমার ইন্দ্রিয় সক্রিয় হল। যেহেতু আমি পুরোটা সময় গার্মেন্টেস খাতেই চাকরি-বাকরি করেছি। তাই বুঝলাম,  তিনিও সেখানকার কোথায়ই হয়তো চাকরি করতেন। আমি আন্দাজে ঢিল ছুড়লাম,
-“গাজীপুরে ছিলেন না?”
উত্তর শুনে মেয়েটার মুখে হাসি ফুটে উঠল। কারণ আমি জানি চিনতে না পারার কথায় একটা সূক্ষ অপমান থাকে। তাই এটা এড়ানোই সবচেয়ে ভালো।
-“জি স্যার। পাঁচতলায় কাজ করতাম। আমি কাকলী, কণিকা…
যাদের নাম বললেন আমার যদিও কাউকেই আলাদা করে মনে নেই। তবুও মাথা নাড়লাম। প্রতিমাসে প্রচুর শ্রমিক আসতেন, যেতেন। সবার ফাইল যদিও আমার হাত ধরেই যেত কিন্তু সব মিলিয়ে হয়ত দুই-একশ মুখ আলাদা করে মনে আছে। বাকি অনেককে দেখলে অবশ্য চেনা লাগে। কিন্তু কোথায় কিভাবে চেনা তা আর মনে পড়ে না। তবুও আন্দাজেই আমার আলাপ এগোল।
জানলাম, তার বাড়ি যশোর। বিয়ে হয়েছে মাহমুদপুরে। চার বছর আগে গার্মেন্টসের চাকরি ছেড়েছেন। এখন সংসার করেন। অভাব আছে। টানাপোড়েন আছে। কিন্তু… হেসে বললেন,
“সকালে আর মুখ না ধুইয়াই দৌড় দিতে হয় না স্যার। সুপারভাইজারের ধমক নাই। টার্গেটের ভয় নাই। রাত-বিরাতে ওভারটাইমের প্যারা নাই। খেয়ে না খেয়ে আছি, কিন্তু মাথাটা শান্তিতে আছে।”
কথাটা শুনে বুকের ভেতর কোথাও যেন একটা পুরোনো স্মৃতি নড়ে উঠল।
গার্মেন্টসে যারা কাজ করেছে, তারা জানেন সেখানে শুধু কাপড় সেলাই হয় না। সেলাই হয় মানুষের সময়। মানুষের যৌবন। মানুষের ঘুম। মানুষের হাসি। মানুষের স্বাধীনতা। একদম লকস্টিচ মেশিনে!
সকালের সূর্য ওঠার আগেই ফ্যাক্টরির পথে হাঁটা। ফিরতে ফিরতে রাত।
আকাশ তখনও থাকে, কিন্তু সময় থাকে না দেখার।  বৃষ্টিও হয়, কিন্তু টের পাওয়া যায় না সেলাই মেশিনের আওয়াজে। কোন ঋতুর পর কোন ‍ঋতু আসে তা কেবল বোঝা যায় দেওয়ালে টানানো ক্যালেন্ডার দেখে। আর জীবনের বাকিটা সময় কেটে যায় কেবল সেলাই মেশিনের সুইয়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে।
মেয়েটি হঠাৎ জিজ্ঞাসা করল, স্যার এখনো কি ওই ফ্যাক্টরীতেই আছেন? আপনার সাথে আরেকজন এডমিন ম্যানেজার ছিল না? মাথায় চুল কম? উনিও কি আছেন?
আমি বললাম, উনি আছেন তবে চাকরি ছেড়ে দিয়েছি আমি…। কয়েকমাস হল। জীবন মানে শুধুতো টাকা না। শান্তিই আসল…
স্ত্রী পাশে বসে মুচকি হাসলেন। সেই হাসির ভেতরে হয়তো একটুখানি খোঁচা লক্ষ্য করলাম। সম্ভবত বুঝলেন যে নিজের চাকরি ছাড়ার যুক্তি হয়তো শক্তিশালী করতে চাচ্ছি।
আমি এবার চুপ করলাম। কারণ সত্যি বলতে, যে মানুষ চাকরি ছেড়ে এসেছে, সে-ই জানে চাকরি ছাড়ার দাম কত। আবার যে মানুষ চাকরি করে যাচ্ছে, সে জানে চাকরি না ছাড়ার দাম কত।
মেয়েটি নানা স্মৃতি বলতে থাকল। চাকরির যে কষ্টের দিনলিপি তার কিছুটা…
অটোরিক্সা চলছিল।
দুপাশের বাতাসে কেটে যাচ্ছিল সময়।
রং বদলাচ্ছিল আকাশ।
হঠাৎ আকাশের রং দেখে স্ত্রীকে বললাম, “দেখো আকাশটা…” সবুজ কচুড়িপানায় ঢাকা ঝাড়কাটা নদীর উপর সূর্য আর মেঘের লুকোচুরি তৈরি করেছিল এক অনাবিল প্রশান্তির দৃশ্য।
সামনের মেয়েটাও তাকাল। সে বলে উঠল, “স্যার… আকাশের এই যে এত রং… চাকরি করে কোনোদিনও দেখি নাই।”
খুব ভারি মনে হল কথাটা।
যদি কোনও একটি বাক্য কখনো পুরো একটা শিল্পাঞ্চলের ইতিহাস লিখে ফেলে। এটাও তেমনি একটি বাক্য হতে পারে।
সে আর কিছু বলেনি।
আমিও না।
অটোরিকশা চলছিল।
বাতাস বইছিল।
স্মৃতির নদে বয়ে যাচ্ছিল বেশ আলোড়ণ।
কত গল্প জানি আমি।
কত মানুষের গল্প।
গার্মেন্টস এক আলাদা জগৎ।
কোটি কোটি গল্প সেখানের।
সে না হয় আজ থাক।
এই পৃথিবীর কত মানুষ কত বছর ধরে সূর্যাস্ত দেখতে পারে না।
আজ এই সন্ধ্যায় দু’জন সাবেক গার্মেন্টস শ্রমিক আকাশ দেখার বিনিময়েই সেই জীবনকে স্মৃতি থেকে মুছে দিচ্ছে কত সহজে। ভাবছিলাম, মানুষের জীবনে সবচেয়ে বড় দারিদ্র্য সব সময় অর্থের অভাব নয়। কখনও কখনও সবচেয়ে বড় অভাব হয় সময়। একটু থেমে আকাশ দেখার, বৃষ্টিতে ভেজার, কিংবা দিনের শেষে সূর্যটা কী রঙে ডুবল, তা দেখার মত একটু সময়।
আমরা গার্মেন্টসের সাফল্যের গল্প লিখি। রপ্তানির হিসাব লিখি। কোটি কোটি ডলারের পরিসংখ্যান লিখি। কিন্তু কোথাও লেখা থাকে না, সেই সাফল্যের পেছনে কত অশ্রু, কত আফসোস!
এই শহরেই কত মানুষ বছরের পর বছর গোধূলির আকাশ দেখেনি!
অথচ আকাশ প্রতিদিনই রং বদলায়।
জীবিকার তাড়নায়, সেই রঙের নাগাল পায় না কত মানুষ!
সামনেই মাহমুদপুর।
মেয়েটি নেমে যাবে।
আমাকে যেতে হবে আরও একটু পথ।
সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসছে।
দু’একটা জোনাকিরা ঘর ছেড়ে বেড়িয়েছে সন্ধ্যার আগেই।
ভাবি… আমরা বোধহয় প্রত্যেকেই জীবনের আকাশে কয়েকটা তারা যোগ করতে গিয়ে আকাশটাই হারিয়ে ফেলি….! অজান্তেই….!
Advertisement