শিক্ষা কেবল কয়েকটি বইয়ের পাতা উল্টে পড়া কিংবা পরীক্ষার খাতায় কিছু উত্তর লিখে নম্বর পাওয়ার নাম নয়। শিক্ষা হলো একটি জাতির বিবেক নির্মাণের কারিগর। একটি শিশুর চোখে যে স্বপ্নের আলো জ্বলে, একজন শিক্ষক সেই আলোর প্রথম প্রহরী। তাঁর হাতে গড়ে ওঠে আগামী দিনের চিকিৎসক, প্রকৌশলী, শিক্ষক, গবেষক, প্রশাসক ও রাষ্ট্রনায়ক।
কিন্তু সেই শিক্ষাঙ্গনেই যখন দেখা যায়, বাংলা পড়াচ্ছেন ইংরেজির শিক্ষক, ধর্ম পড়াচ্ছেন বিজ্ঞানের শিক্ষক, বিজ্ঞান পড়াচ্ছেন কৃষির শিক্ষক, আর অংক করাচ্ছেন সমাজবিজ্ঞানের শিক্ষক, তখন প্রশ্ন জাগে, আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা কি সত্যিই তার কাঙ্ক্ষিত পথে এগোচ্ছে?
একজন শিক্ষক যখন নিজের বিষয় ছেড়ে অন্য বিষয়ের পাঠদান করতে বাধ্য হন, তখন তাঁর মেধা, শ্রম ও সময়ের একটি বড় অংশ চলে যায় প্রস্তুতির ঘাটতি পূরণে। আর সেই ঘাটতির সবচেয়ে বড় মূল্য দিতে হয় শিক্ষার্থীদের।
বাংলা ভাষা শুধু ব্যাকরণ ও সাহিত্য পাঠের বিষয় নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে একটি জাতির ইতিহাস, সংস্কৃতি, অনুভূতি ও আত্মপরিচয়। ইংরেজি কেবল কিছু শব্দ ও বাক্য শেখার বিষয় নয়, এর সঙ্গে রয়েছে ভাষাগত দক্ষতা ও যোগাযোগের বিস্তৃত জগৎ। বিজ্ঞান শুধু কয়েকটি সূত্র কিংবা সংজ্ঞা নয়, এটি প্রশ্ন করার, যুক্তি খোঁজার এবং প্রকৃতিকে বোঝার এক বিস্ময়কর পথ। গণিতও শুধু সংখ্যার হিসাব নয়, এটি চিন্তার শৃঙ্খলা ও যুক্তির অনুশীলন।
অতএব, একজন বিষয়ের শিক্ষককে সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়ে দাঁড় করিয়ে দিয়ে আমরা হয়তো একটি খালি ক্লাসরুম পূরণ করতে পারি, কিন্তু শিক্ষার্থীর জ্ঞানের শূন্যতা পূরণ করতে পারি না।
একজন বিজ্ঞানের শিক্ষককে যখন ধর্ম পড়াতে হয়, একজন কৃষি বিষয়ের শিক্ষককে যখন বিজ্ঞান পড়াতে হয়, কিংবা সমাজবিজ্ঞানের শিক্ষককে যখন গণিতের দায়িত্ব নিতে হয়, তখন তাঁদের ব্যক্তিগত দক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা উদ্দেশ্য নয়। বরং প্রশ্নটি বৃহত্তর ব্যবস্থার দিকে।
কেন একজন শিক্ষককে তাঁর প্রশিক্ষণ ও দক্ষতার বাইরে গিয়ে পাঠদান করতে হবে?
শিক্ষকরা তো শিক্ষাব্যবস্থার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সৈনিক। তাঁদের হাতে অস্ত্র নয়, বই; তাঁদের যুদ্ধক্ষেত্র শ্রেণিকক্ষ; আর তাঁদের বিজয় হলো একজন শিক্ষার্থীর জ্ঞানী, নৈতিক ও দক্ষ মানুষ হয়ে ওঠা। সেই সৈনিকের হাতেই যদি প্রয়োজনীয় অস্ত্র না থাকে, তাহলে যুদ্ধের ফল কীভাবে কাঙ্ক্ষিত হবে?
বাস্তবতা হলো, অনেক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষক সংকট দীর্ঘদিনের সমস্যা। কোথাও শূন্য পদ পূরণ হচ্ছে না, কোথাও প্রয়োজনের তুলনায় শিক্ষক কম, আবার কোথাও বিষয়ভিত্তিক শিক্ষক না থাকায় একজন শিক্ষককে একাধিক বিষয়ের দায়িত্ব নিতে হচ্ছে। প্রতিষ্ঠানপ্রধানরাও অনেক সময় বাধ্য হয়ে বিদ্যমান জনবল দিয়েই পাঠদানের কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছেন।
কিন্তু ব্যবস্থার এই অসংগতি যেন শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যতের ওপর স্থায়ী ছাপ না ফেলে, সেটিই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
একটি গাছকে যদি তার প্রয়োজনীয় আলো, পানি ও মাটি না দেওয়া হয়, তবে তার বেড়ে ওঠা ব্যাহত হয়। শিক্ষার্থীর মেধাও তেমনই। তাকে যদি সঠিক সময়ে সঠিক বিষয়ের উপযুক্ত শিক্ষক না দেওয়া হয়, তাহলে তার সম্ভাবনার অনেক দরজা হয়তো অকালেই বন্ধ হয়ে যেতে পারে।
আমরা প্রায়ই শিক্ষার মান নিয়ে কথা বলি। পরীক্ষার ফলাফল নিয়ে আলোচনা করি। জিপিএ, পাসের হার, মেধাতালিকা নিয়ে হিসাব করি। কিন্তু খুব কমই প্রশ্ন করি, একজন শিক্ষার্থী যে বিষয়টি পড়ছে, সেই বিষয়টি পড়ানোর জন্য তার সামনে কি যথাযথ শিক্ষক রয়েছেন?
শিক্ষার মান শুধু পরীক্ষার ফলাফলে মাপা যায় না। একজন শিক্ষার্থী কতটা বুঝতে পারছে, কতটা যুক্তি দিয়ে ভাবতে পারছে, কতটা প্রশ্ন করতে পারছে এবং বাস্তব জীবনে অর্জিত জ্ঞান কতটা প্রয়োগ করতে পারছে, সেটিও শিক্ষার মানের গুরুত্বপূর্ণ মাপকাঠি।
তাই এখন প্রয়োজন সাময়িক জোড়াতালি নয়, প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা। প্রতিটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে বিষয়ভিত্তিক শিক্ষক নিশ্চিত করতে হবে। শূন্য পদ দ্রুত পূরণ করতে হবে। শিক্ষক নিয়োগ ও পদায়নে বাস্তব চাহিদাকে গুরুত্ব দিতে হবে। একই সঙ্গে শিক্ষকদের নিয়মিত প্রশিক্ষণ ও পেশাগত দক্ষতা বৃদ্ধির সুযোগও বাড়াতে হবে।
কারণ, একটি ক্লাসের ঘাটতি হয়তো পরের দিন পূরণ করা যায়, কিন্তু একটি প্রজন্মের শিক্ষাগত ঘাটতি পূরণ করা যায় না সহজে।
শিক্ষাঙ্গন যেন এমন একটি জায়গা হয়, যেখানে বাংলা শেখাবেন বাংলার শিক্ষক, গণিত শেখাবেন গণিতের শিক্ষক, বিজ্ঞান শেখাবেন বিজ্ঞানের শিক্ষক, ধর্মীয় শিক্ষা দেবেন সংশ্লিষ্ট বিষয়ে দক্ষ শিক্ষক। প্রত্যেক শিক্ষক তাঁর জ্ঞান, অভিজ্ঞতা ও মেধা দিয়ে একটি করে প্রদীপ জ্বালাবেন।
সেই প্রদীপের আলোয় আলোকিত হবে একটি প্রজন্ম।
আজকের প্রশ্ন তাই শুধু ‘কে কোন বিষয় পড়াচ্ছেন?’ নয়। প্রশ্ন আরও গভীর—
আমরা কি শিক্ষার্থীদের হাতে জ্ঞানের প্রদীপ তুলে দিচ্ছি, নাকি শিক্ষক সংকটের অন্ধকারে তাদের ভবিষ্যৎকে ধীরে ধীরে হারিয়ে ফেলছি?
শিক্ষার ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবার এখনই সময়। কারণ একটি জাতির আগামীকাল কেমন হবে, তার উত্তর লেখা হয় আজকের শ্রেণিকক্ষে।
– আব্দুর রহিম খান, লেখক ও সাংবাদিক

