Skip to content
প্রকাশ- November 2, 2026 , 17:20 pm
মাদারগঞ্জ

ছাত্র রাজনীতি: ক্ষমতার মঞ্চ নয়, ইনসাফ ও নেতৃত্ব গড়ার পাঠশালা

ছাত্র রাজনীতি: ক্ষমতার মঞ্চ নয়, ইনসাফ ও নেতৃত্ব গড়ার পাঠশালা

একটি জাতির ভবিষ্যৎ নির্ধারিত হয় তার তরুণদের চিন্তা, চরিত্র ও নেতৃত্বের মাধ্যমে। আজকের শিক্ষার্থীই আগামী দিনের রাষ্ট্রনায়ক, আইনপ্রণেতা, শিক্ষক, বিচারক ও সমাজসংস্কারক। তাই ছাত্রজীবন কেবল পরীক্ষায় ভালো ফল করার সময় নয়, বরং আদর্শ, নৈতিকতা, দায়িত্ববোধ এবং নেতৃত্ব অর্জনেরও সুবর্ণ সময়।

ছাত্র রাজনীতি সেই নেতৃত্ব গড়ার অন্যতম মাধ্যম। কিন্তু যখন ছাত্র রাজনীতি আদর্শ থেকে বিচ্যুত হয়ে ক্ষমতার প্রতিযোগিতা, সহিংসতা বা ব্যক্তিস্বার্থের হাতিয়ারে পরিণত হয়, তখন তা শিক্ষাঙ্গন, সমাজ এবং রাষ্ট্রের জন্য ক্ষতিকর হয়ে ওঠে।

Advertisement

ইসলাম মানুষের প্রতিটি কাজকে ইবাদতের মর্যাদা দিয়েছে, যদি তা আল্লাহর সন্তুষ্টি ও মানুষের কল্যাণের উদ্দেশ্যে হয়। রাজনীতি কিংবা নেতৃত্বও এর ব্যতিক্রম নয়। ইসলামের দৃষ্টিতে নেতৃত্ব কোনো সম্মান বা প্রভাব বিস্তারের মাধ্যম নয়, বরং এটি একটি আমানত। একজন নেতা তার অনুসারীদের প্রতি জবাবদিহির দায় বহন করেন।

পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন,

“নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের নির্দেশ দেন, তোমরা যেন আমানত তার প্রাপকের কাছে পৌঁছে দাও এবং যখন মানুষের মধ্যে বিচার করবে, তখন ন্যায়বিচারের সঙ্গে বিচার করবে।”
(সূরা আন-নিসা: ৫৮)

এই শিক্ষা ছাত্র রাজনীতির জন্যও সমানভাবে প্রযোজ্য। নেতৃত্বের প্রথম শর্ত হলো আমানতদারিতা, ন্যায়বিচার এবং সততা।

ছাত্র রাজনীতির প্রধান লক্ষ্য হওয়া উচিত শিক্ষার্থীদের ন্যায্য অধিকার আদায়, শিক্ষার মানোন্নয়ন, ক্যাম্পাসে নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করা এবং জ্ঞানচর্চার অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি করা। পাশাপাশি সামাজিক অবিচারের বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়া, দুর্নীতির বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া, মানবিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণ করা এবং জাতীয় সংকটে মানুষের পাশে দাঁড়ানোও একজন ছাত্রনেতার দায়িত্ব।

রাসূল ﷺ বলেছেন,

“তোমাদের প্রত্যেকেই একজন দায়িত্বশীল, এবং প্রত্যেককে তার দায়িত্ব সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হবে।”
(সহিহ আল-বুখারি ও সহিহ মুসলিম)

এই হাদিস আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়, নেতৃত্ব মানে জবাবদিহি। ছাত্রনেতাও এর বাইরে নন।

বাংলাদেশের ইতিহাসে ছাত্রসমাজের অবদান অনস্বীকার্য। ভাষা আন্দোলন, স্বাধীনতা সংগ্রাম এবং গণতান্ত্রিক আন্দোলনসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সময়ে ছাত্রসমাজ সাহসিকতা, ত্যাগ ও দেশপ্রেমের উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। তাদের শক্তি ছিল আদর্শ, ঐক্য এবং জনগণের প্রতি দায়বদ্ধতা।

কিন্তু যখন ছাত্র রাজনীতি দখলদারিত্ব, সহিংসতা, প্রতিহিংসা, চাঁদাবাজি কিংবা ক্ষমতার লড়াইয়ে জড়িয়ে পড়ে, তখন তা নিজের অস্তিত্বকেই প্রশ্নবিদ্ধ করে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান জ্ঞানচর্চার কেন্দ্র থেকে সংঘাতের কেন্দ্রে পরিণত হয়। এতে ক্ষতিগ্রস্ত হয় শিক্ষার্থী, অভিভাবক এবং পুরো জাতি।

ইসলাম অন্যায় ও জুলুমকে কঠোরভাবে নিরুৎসাহিত করেছে। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন,

“তোমরা ন্যায় ও তাকওয়ার কাজে একে অপরকে সহযোগিতা করো। পাপ ও সীমালঙ্ঘনের কাজে সহযোগিতা করো না।”
(সূরা আল-মায়িদাহ: ২)

এই আয়াত ছাত্র রাজনীতির জন্য একটি সুস্পষ্ট নীতিমালা। কোনো সংগঠন, দল বা ব্যক্তির প্রতি আনুগত্য কখনোই ন্যায়বিচার, সততা ও মানবিকতার ঊর্ধ্বে হতে পারে না।

আজ দেশের প্রয়োজন এমন ছাত্র রাজনীতি, যা ক্যাম্পাসে ভয়ের নয়, জ্ঞানের পরিবেশ সৃষ্টি করবে। যে রাজনীতি বিভাজনের নয়, ঐক্যের কথা বলবে। যে রাজনীতি প্রতিপক্ষকে শত্রু নয়, ভিন্নমতের মানুষ হিসেবে সম্মান করবে। যে রাজনীতি ব্যক্তিস্বার্থের পরিবর্তে দেশ, জাতি ও মানুষের কল্যাণকে অগ্রাধিকার দেবে।

ছাত্র রাজনীতির প্রকৃত সাফল্য মিছিলের ভিড়ে নয়, বরং একজন সৎ, দক্ষ ও নৈতিক নেতৃত্ব গড়ে তোলার মধ্যে। কারণ আজকের ছাত্রনেতাই আগামী দিনের রাষ্ট্রনায়ক। ছাত্রজীবনে যে আদর্শ গড়ে ওঠে, রাষ্ট্র পরিচালনায় তারই প্রতিফলন দেখা যায়।

পরিশেষে বলা যায়, ছাত্র রাজনীতি যদি সত্য, ন্যায়, জবাবদিহি, মানবিকতা ও দেশপ্রেমের ভিত্তিতে পরিচালিত হয়, তবে তা জাতির জন্য আশীর্বাদ। আর যদি তা ক্ষমতা, সহিংসতা ও ব্যক্তিস্বার্থের পথে পরিচালিত হয়, তবে তা জাতির ভবিষ্যতের জন্য উদ্বেগের কারণ।

ছাত্র রাজনীতির সর্বোচ্চ পরিচয় ক্ষমতায় নয়, চরিত্রে। পদে নয়, দায়িত্বে। স্লোগানে নয়, সেবায়। আর ব্যক্তিস্বার্থে নয়, ইনসাফ ও মানুষের কল্যাণে।

– আব্দুর রহিম খান, লেখক ও সাংবাদিক

Advertisement