Skip to content
প্রকাশ- November 2, 2026 , 15:34 pm
বকশীগঞ্জ

শিমুল আলুতে সম্ভাবনার হাতছানি, পাহাড়ি জমিতে কৃষকের নতুন স্বপ্ন

শিমুল আলুতে সম্ভাবনার হাতছানি, পাহাড়ি জমিতে কৃষকের নতুন স্বপ্ন

একসময় অনেকটা অবহেলিত ও কম পরিচিত ফসল হিসেবে পড়ে থাকলেও বর্তমানে সম্ভাবনাময় অর্থকরী ফসল হিসেবে কৃষকদের নজর কাড়ছে শিমুল আলু বা কাসাভা। স্থানীয়ভাবে কোথাও কোথাও এটি ‘কাঠা আলু’ নামেও পরিচিত। কাসাভার বৈজ্ঞানিক নাম Manihot esculenta। তুলনামূলক অনুর্বর ও পাহাড়ি জমিতেও চাষ করা যায় বলে ধীরে ধীরে কৃষকদের কাছে আগ্রহের ফসল হয়ে উঠছে এটি।

দেশের বিভিন্ন পাহাড়ি ও অপেক্ষাকৃত অনুর্বর জমিতে কাসাভার চাষ হয়ে থাকে। এরই ধারাবাহিকতায় জামালপুরের বকশীগঞ্জ উপজেলার সীমান্তঘেঁষা লাউচাপড়া-বালিঝুরি সুন্নাতপাড়া পাহাড়ি এলাকায় দেখা মিলেছে শিমুল আলুর চাষ। ধানুয়া কামালপুর ইউনিয়নের সুন্নাতপাড়া গ্রামের পাহাড়ের ঢালে কয়েক একর জমিতে কৃষকরা এ ফসলের আবাদ করছেন। পাহাড়ি ঢালু ও অপেক্ষাকৃত অনুর্বর জমিতে অন্যান্য ফসলের তুলনায় কাসাভার চাষে সম্ভাবনা দেখছেন স্থানীয় কৃষকরা।

Advertisement

সুন্নাতপাড়া গ্রামের আদিবাসী কৃষক সাগর খাগসী দীর্ঘদিন ধরে শিমুল আলুর চাষ করে আসছেন। প্রতি বছরের মতো এবারও তিনি এ ফসলের আবাদ করেছেন। শুরুতে অনেকটা পরীক্ষামূলকভাবে চাষ করলেও ফলন পাওয়ার পর ধীরে ধীরে তার আগ্রহ বেড়েছে।

কৃষক সাগর খাগসী জানান, গত বছর তিনি অল্প জমিতে শিমুল আলুর চাষ করেছিলেন। ফলন মোটামুটি ভালো হওয়ায় এবার তিনি বড় পরিসরে চাষের সিদ্ধান্ত নেন। চলতি মৌসুমে প্রায় দুই একর জমিতে কাসাভার আবাদ করেছেন তিনি।

তিনি বলেন, “গত বছর অল্প জমিতে চাষ করে ভালো ফলন পেয়েছিলাম। তাই এবার জমির পরিমাণ বাড়িয়েছি। এবারও গত বছরের তুলনায় ভালো ফলনের আশা করছি। এ ফসলে সার ও কীটনাশকের ব্যবহার তুলনামূলক কম লাগে। ফলে উৎপাদন খরচও কম হয়।”  

স্থানীয় কৃষকদের ভাষ্য, পাহাড়ি ও অপেক্ষাকৃত অনুর্বর জমিতে অন্যান্য ফসলের চাষ করতে যেখানে নানা ধরনের প্রতিবন্ধকতার মুখোমুখি হতে হয়, সেখানে কাসাভা তুলনামূলক সহজে চাষ করা যায়। গাছের পরিচর্যাও খুব বেশি করতে হয় না। রোগবালাই ও পোকার আক্রমণ তুলনামূলক কম হওয়ায় কীটনাশকের প্রয়োজনও কম পড়ে বলে জানান কৃষকরা।

স্থানীয় কৃষক জসিম বলেন, “আমাদের এলাকার অনেক জমি পাহাড়ি ও অনুর্বর। সব ফসল এখানে ভালো হয় না। কিন্তু শিমুল আলু এসব জমিতেও ভালোভাবে বেড়ে ওঠে। পরিচর্যা কম, খরচও তুলনামূলক কম। বাজারে ভালো দাম পাওয়া গেলে এটি আমাদের জন্য লাভজনক ফসল হতে পারে।”

স্থানীয় আরেক কৃষক আদিবাসী প্রবিদ জানান, কাসাভার চাষ সম্পর্কে আগে তাদের মধ্যে তেমন ধারণা ছিল না। এখন অন্য কৃষকদের চাষ দেখে অনেকেই আগ্রহী হচ্ছেন। কৃষি বিভাগ থেকে প্রয়োজনীয় পরামর্শ এবং বাজারজাতকরণে সহযোগিতা পাওয়া গেলে এ অঞ্চলে আরও বেশি কৃষক কাসাভা চাষে আগ্রহী হবেন বলে মনে করেন তিনি।

শুধু কৃষকের আয় বাড়ানোর সম্ভাবনাই নয়, খাদ্য হিসেবেও কাসাভার রয়েছে উল্লেখযোগ্য পুষ্টিগুণ। কাসাভার কন্দে প্রধানত শর্করা বা কার্বোহাইড্রেট থাকে, যা শরীরে শক্তির অন্যতম উৎস। এতে সামান্য পরিমাণে খাদ্যআঁশ, ভিটামিন ও বিভিন্ন খনিজ উপাদানও পাওয়া যায়।

কাসাভায় থাকা কার্বোহাইড্রেটের কারণে এটি শক্তিদায়ক খাদ্য হিসেবে ব্যবহৃত হয়। এছাড়া কাসাভার কন্দ থেকে কাসাভা আটা, স্টার্চ বা শ্বেতসার তৈরি করা যায়। বিভিন্ন খাদ্যপণ্য ও শিল্পেও কাসাভা থেকে উৎপাদিত স্টার্চের ব্যবহার রয়েছে।

তবে কাসাভা কাঁচা অবস্থায় সরাসরি খাওয়া নিরাপদ নয়। বিশেষ করে তেতো জাতের কাসাভায় প্রাকৃতিকভাবে সায়ানোজেনিক যৌগ থাকতে পারে, যা সঠিকভাবে প্রক্রিয়াজাত না করলে ক্ষতিকর হতে পারে। তাই কাসাভা খাওয়ার আগে জাতভেদে উপযুক্ত প্রক্রিয়ায় খোসা ছাড়ানো, কাটা, ভিজানো ও রান্না বা প্রক্রিয়াজাত করা প্রয়োজন।

পুষ্টিবিদদের মতে, কাসাভাকে এককভাবে সম্পূর্ণ পুষ্টিকর খাবারের বিকল্প না ধরে অন্যান্য শাকসবজি, ডাল, মাছ, মাংস, ডিমসহ বৈচিত্র্যময় খাদ্যতালিকার অংশ হিসেবে গ্রহণ করাই যুক্তিযুক্ত।

কাসাভার ব্যবহার শুধু খাদ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। এর কন্দ থেকে উৎপাদিত স্টার্চ বিভিন্ন খাদ্যপণ্য, বেকারি সামগ্রী, নুডলসসহ নানা পণ্যে ব্যবহার করা হয়। শিল্পক্ষেত্রেও কাসাভা স্টার্চের ব্যবহার রয়েছে।

এ কারণে কাসাভার চাষ সম্প্রসারণের পাশাপাশি স্থানীয় পর্যায়ে যদি প্রক্রিয়াজাতকরণ ও বাজারজাতকরণের ব্যবস্থা গড়ে ওঠে, তাহলে কৃষকরা কাঁচা কন্দ বিক্রির পাশাপাশি মূল্য সংযোজনের সুযোগও পেতে পারেন। এতে স্থানীয়ভাবে কর্মসংস্থান ও কৃষিভিত্তিক ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা তৈরির সম্ভাবনাও তৈরি হতে পারে।

কৃষি সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দেশের অনেক পাহাড়ি ও অনুর্বর জমি প্রচলিত ফসল উৎপাদনের জন্য খুব বেশি উপযোগী নয়। এসব জমিকে কৃষির আওতায় এনে উৎপাদন বাড়াতে বিকল্প ফসলের চাষ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। কাসাভা তেমনই একটি ফসল।

শিমুল আলুর গাছ তুলনামূলক প্রতিকূল পরিবেশেও বেড়ে উঠতে পারে। এর মূল বা কন্দই প্রধানত খাদ্য ও বিভিন্ন শিল্পে ব্যবহারের উপযোগী। ফলে স্থানীয় পর্যায়ে এর চাহিদা ও বাজার সম্প্রসারণ করা গেলে কৃষকদের জন্য এটি একটি নতুন অর্থকরী ফসল হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হতে পারে।

বকশীগঞ্জ উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা আমিনুল ইসলাম বলেন, কাসাভা বা শিমুল আলু তুলনামূলকভাবে কম উর্বর ও পাহাড়ি জমিতে চাষের উপযোগী একটি ফসল। সঠিক ব্যবস্থাপনা ও পরিচর্যার মাধ্যমে এ ফসল থেকে ভালো ফলন পাওয়া সম্ভব।

তিনি বলেন, “বকশীগঞ্জের পাহাড়ি এলাকার যেসব জমিতে প্রচলিত ফসলের আবাদ তুলনামূলক কঠিন, সেসব জমিতে বিকল্প ফসল হিসেবে কাসাভা চাষের সম্ভাবনা রয়েছে। কৃষকরা যদি ভালো ফলন ও ন্যায্যমূল্য পান, তাহলে ভবিষ্যতে এ ফসলের আবাদ আরও সম্প্রসারিত হতে পারে।”

কৃষি কর্মকর্তা আরও বলেন, কাসাভা চাষে কৃষকদের প্রয়োজনীয় কারিগরি পরামর্শ দেওয়া হবে। পাশাপাশি উৎপাদন, ফলন, বাজারজাতকরণ ও কৃষকের লাভ-ক্ষতির বিষয়গুলো পর্যবেক্ষণ করে এ ফসলের সম্ভাবনা বিবেচনা করা হবে।

কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, নতুন এ ফসল নিয়ে তাদের মধ্যে আগ্রহ তৈরি হচ্ছে। বিশেষ করে যেসব পাহাড়ি বা অনুর্বর জমিতে ধান, সবজি কিংবা অন্যান্য প্রচলিত ফসলের আবাদ করা কঠিন, সেসব জমিতে কাসাভাকে বিকল্প হিসেবে দেখছেন তারা।

তবে কৃষকদের মতে, উৎপাদনের পাশাপাশি বাজারজাতকরণ ও ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা জরুরি। কাসাভার বাজার, সংরক্ষণ ও প্রক্রিয়াজাতকরণের সুযোগ তৈরি হলে কৃষকরা আরও বেশি উৎসাহিত হবেন।

একসময় অবহেলায় পড়ে থাকা শিমুল আলু এখন পাহাড়ি কৃষকদের কাছে নতুন সম্ভাবনার নাম হয়ে উঠছে। কম উর্বর জমিতে তুলনামূলক কম খরচে আবাদ, কম পরিচর্যা এবং ভালো ফলনের সম্ভাবনা—সব মিলিয়ে কাসাভা হতে পারে সীমান্তবর্তী পাহাড়ি এলাকার কৃষকদের জন্য একটি বিকল্প অর্থকরী ফসল।

সুন্নাতপাড়া পাহাড়ের ঢালে সাগর খাগসীর দুই একর জমির কাসাভার আবাদ তাই শুধু একটি ফসলের চাষ নয়; বরং অনাবাদি ও অনুর্বর পাহাড়ি জমিকে উৎপাদনের আওতায় এনে কৃষকের আয় বাড়ানোর সম্ভাবনারও একটি উদাহরণ। ফলন ও বাজারদর সন্তোষজনক হলে আগামী দিনে বকশীগঞ্জের পাহাড়ি অঞ্চলে শিমুল আলুর আবাদ আরও বিস্তৃত হতে পারে—এমন প্রত্যাশাই স্থানীয় কৃষকদের।

Advertisement