আতিকুর রহমান (আতিক): রাজনৈতিক অঙ্গনে বাংলাদেশ বরাবরই আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু। কখনো নন্দিত আবার কখনো নিন্দিত। বাংলাদেশের একজন নাগরিক হিসেবে গর্বের জায়গা বলতে আমাদের এতটুকু যে, শাসকের যুলুমের বিপরীতে সংগ্রাম করে বাঁচতে হয়। সংগ্রামী জীবনের প্রতিটি প্রহরের চাহিদায় অনেক নাগরিককে বরণ করে নিতে হয় অভাব অনটন, দুর্ভোগ আর নিরাপত্তাহীনতার মতো সংগ্রামী জীবন। ন্যায়নীতিবান ও খোদাভীরু মানুষকে জেল-যুলুম নির্যাতন সহ্য করে নিজেকে খাঁটি সোনা প্রমাণ দিতে হয়। ভারতীয় আধিপত্যবাদের বিরোধী হলে এখানে ফাঁসির মঞ্চে যাওয়ার প্রস্তুতি রাখতে হয়। অথচ বাংলাদেশ একটি গণতান্ত্রিক দেশ। প্রকৃতপক্ষে গণতন্ত্র হলো একটি শাসনব্যবস্থা যেখানে জনগণই দেশের সার্বভৌম ক্ষমতার উৎস। এ ব্যবস্থায় জনগণ সরাসরি বা নির্বাচিত প্রতিনিধিদের মাধ্যমে সরকারের কার্যক্রম পরিচালনা করে এবং গণতন্ত্রের মূল বৈশিষ্ট্যগুলো হলো-
১. জনগণের অংশগ্রহণ : নাগরিকেরা ভোট দিয়ে তাদের প্রতিনিধি নির্বাচন করে।
২. আইনের শাসন : সকল নাগরিক, সরকার ও প্রতিষ্ঠান আইনের অধীন।
৩. স্বাধীনতা ও মানবাধিকার : মত প্রকাশের স্বাধীনতা, ধর্ম পালনের অধিকার, এবং সাম্য নিশ্চিত করা হয়।
৪.জবাবদিহিতা : সরকার জনগণের কাছে জবাবদিহি করতে বাধ্য।
৫. সংখ্যালঘুর অধিকার রক্ষা : সংখ্যাগুরু মতামতের পাশাপাশি সংখ্যালঘুদের অধিকারকেও সুরক্ষা দেওয়া হয়।
সবচেয়ে বড় বিষয়, গণতন্ত্রের একটি আদর্শ উদাহরণ হলো এমন একটি সরকার যা জনগণের জন্য, জনগণের দ্বারা এবং জনগণের মধ্যে শাসন প্রতিষ্ঠিত হয়। কিন্তু পরিতাপের বিষয় হলো- উপরিউক্ত বৈশিষ্ট্যের কোনো ছিটেফোঁটাও বাংলাদেশের গণতন্ত্রে বিদ্যমান নেই।
এবার একটু রাষ্ট্রবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে স্বৈরশাসকের পরিচয় সম্পর্কে ধারণা রাখি- স্বৈরশাসক (Dictator) হলো এমন একজন শাসক যিনি এককভাবে এবং প্রায়শই জোরপূর্বক বা অগণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে ক্ষমতা দখল করেন এবং পরিচালনা করেন। স্বৈরশাসকের ক্ষমতা সাধারণত সীমাহীন হয় এবং তিনি প্রায়শই আইন, সংবিধান বা সাধারণ মানুষের ইচ্ছাকে উপেক্ষা করেন।
স্বৈরশাসকের বৈশিষ্ট্যসমূহ-
১. একক ক্ষমতা বাস্তবায়ন : সমস্ত সিদ্ধান্ত ও পরামর্শে অন্যের অমুখাপেক্ষী।
২. গণতন্ত্রবিরোধী আচরণ : জনগণের মতামত বা ভোটাধিকারকে গুরুত্বহীন মনে করা।
৩. বিরোধীদের দমন-নিপীড়ন : বিরোধীদের প্রতি কঠোর মনোভাব, প্রায়শই তাদের জেল বা হত্যার মাধ্যমে দমন করা।
৪. আইনের অপব্যবহার ও অপপ্রয়োগ : নিজের ক্ষমতা টিকিয়ে রাখতে আইনকে নিজস্ব স্বার্থে ব্যবহার করা।
৫. ভীতিকর পরিবেশ সৃষ্টি ও প্রচার : নিজের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করতে এবং জনগণকে ভয় দেখাতে ভীতি প্রচার করা। ইতিহাসে অনেক স্বৈরশাসকের উদাহরণ পাওয়া যায়। যেমন হিটলার (জার্মানি), মুসোলিনি (ইতালি)। সম্প্রতি বাংলাদেশসহ কিছু দেশে দেখা যায়, যারা নিজেদের ক্ষমতায় রাখার জন্য জনগণের অধিকারকে শুধু উপেক্ষা-ই নয় বরং নিজেকে ভয়ানক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে।
মহান স্বাধীনতার পরবর্তী সরকার গঠনের পর সকল রাজনৈতিক দলের মধ্যে স্বৈরতন্ত্রের ৫টি বৈশিষ্ট্যের কোনোটি অবর্তমান ছিল না। এতে করে আকাশচুম্বী জনপ্রিয়তা মাটির সাথে মিশে গেছে বলিষ্ঠ নেতৃত্বের অধিকারীদের। ২০২৪-এর গণঅভ্যূত্থান বাংলাদেশকে সুন্দর একটি পথ দেখাবে বলে মনে করছেন দেশের আপামর শান্তিকামী জনগণ। কিন্তু কিছু রাজনৈতিক দলের আচরণ অনেকটা ইতিহাসের পুনরাবৃত্তির বার্তা বহন করছে।
যে স্বৈরতন্ত্রের বলয় থেকে মুক্তি পেতে চায় দেশের মুক্তিকামীরা, তার জন্য দরকার ছিল ৭টি যুগান্তকারী পদক্ষেপ। বলতে গেলে- স্বৈরতন্ত্র বা ডিকটেটরশিপের অবসান একটি জটিল ও চ্যালেঞ্জিং প্রক্রিয়া, তবে একটি গণতান্ত্রিক, ন্যায়ভিত্তিক ও স্থিতিশীল সমাজ গড়ার জন্য এটি অপরিহার্য। এর জন্য বিভিন্ন ধরনের পদক্ষেপ গ্রহণ করা যেতে পারে, যেমন :
১. সংবিধান সংশোধন ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা : স্বৈরতন্ত্রের বিলোপে প্রয়োজনে সংবিধান সংশোধন করে সংবিধান মেনে চলার উদার দৃষ্টি প্রদর্শন। আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করা এবং যেকোনো স্বৈরাচারী সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে দ্রুত আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা।
২. শক্তিশালী গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান তৈরি : নির্বাচন কমিশন, বিচার বিভাগ এবং সংসদকে স্বাধীন ও শক্তিশালী করার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ। এসব প্রতিষ্ঠানের ওপর রাজনৈতিক ব্যক্তিদের হস্তক্ষেপ ঠেকানো।
৩. সামরিক বাহিনীর নিরপেক্ষতা নিশ্চিতকরণন : সামরিক বাহিনীকে রাজনীতি থেকে দূরে রাখা এবং তাদের শুধুমাত্র দেশের সুরক্ষা ও শান্তি বজায় রাখার কাজে সীমাবদ্ধ করা। সেনাবাহিনীর মধ্যে পেশাদারিত্ব ও দেশাত্ববোধ নিশ্চিত করা।
৪. গণসচেতনতা বৃদ্ধি : জনগণকে তাদের অধিকার, গণতন্ত্রের গুরুত্ব এবং স্বৈরতন্ত্রের ক্ষতিকারক প্রভাব সম্পর্কে সচেতন করা । প্রয়োজনে শিক্ষা ও মিডিয়া ব্যবহার করে সচেতনতা বাড়ানো যেতে পারে।
৫. শান্তিপূর্ণ আন্দোলন : গণতান্ত্রিক উপায়ে শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ ও আন্দোলনের মাধ্যমে স্বৈরতন্ত্রের দোসরদের বিরুদ্ধে জনমত তৈরি করা। অহিংসা বজায় রেখে রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিবর্তনের জন্য চাপ সৃষ্টি করার পেক্ষাপট সৃষ্টি।
৬. আন্তর্জাতিক সমর্থন আদায় : আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সমর্থন আদায়ে বিভিন্ন পলিসি মেকিং এবং পলিসির ইতিবাচক দিক সম্পর্কে জাতিসঙ্ঘ, মানবাধিকার সংস্থা ও গণতান্ত্রিক দেশগুলোতে প্রতিবেদন জমা।
৭. রাজনৈতিক দলসমূহের সংহতি তৈরি : সব রাজনৈতিক দল ও বিভিন্ন সংগঠনকে ঐক্যবদ্ধ হয়ে স্বৈরতন্ত্রবিরোধী পদক্ষেপ নেওয়া । যার মূল লক্ষ্য থাকবে ব্যক্তিগত বা দলীয় স্বার্থ ত্যাগ করে জনগণের স্বার্থে কাজ করা।
এখন প্রশ্ন হচ্ছে- দল, মত, পেশা, ধর্ম ও বর্ণ নির্বিশেষে যে চেতনার জন্য দ্বিতীয় স্বাধীনতার স্বাদ ভোগ করছে মুক্তিকামীরা, সে চেতনা কি আদৌ বাস্তবায়নের মুখ দেখবে? প্রয়োজনীয় সংস্কারের মাধ্যমে আমরা কি জায়গা করে নিতে পারব মুক্তিকামী মানুষের দলে?
লেখক : সাবেক সভাপতি, স্টুডেন্ট ওয়েলফেয়ার এসোসিয়েশন, জামালপুর জেলা
- এই নিবন্ধে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব এবং মুক্তকালের সম্পাদকীয় অবস্থানকে প্রতিফলিত করে না।
