মানুষের ধর্মচেতনার ইতিহাসে একটি চিরন্তন প্রশ্ন আছে: অদৃশ্যকে মানুষ কীভাবে অনুভব করবে?
যে সত্তাকে চোখে দেখা যায় না, হাত দিয়ে ছোঁয়া যায় না, ভাষায় সম্পূর্ণ প্রকাশ করা যায় না, মানুষ তাকে কীভাবে হৃদয়ের কাছে আনবে? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়েই পৃথিবীর বিভিন্ন ধর্ম ও সংস্কৃতিতে প্রতীক, রূপ, চিহ্ন ও আচার-অনুষ্ঠানের জন্ম হয়েছে।
সনাতন ধর্মীয় ঐতিহ্যে প্রতিমা পূজাকেও সেই বৃহত্তর ধর্মচেতনার একটি বিশেষ প্রকাশ হিসেবে দেখা যায়।
তবে বিষয়টি বোঝার আগে একটি কথা মনে রাখা প্রয়োজন। হিন্দু ধর্ম একক কোনো মতবাদ নয়। বেদ, উপনিষদ, গীতা, পুরাণ, আগম-তন্ত্র এবং বিভিন্ন দর্শন ও সম্প্রদায়ের মধ্যে ঈশ্বর, দেবতা ও প্রতিমা সম্পর্কে ব্যাখ্যার পার্থক্য রয়েছে। ফলে একটি ব্যাখ্যাকে সব হিন্দুর অভিন্ন বিশ্বাস হিসেবে তুলে ধরা ঠিক হবে না।
এক সত্য, বহু নাম
ঋগ্বেদের একটি বহুল উদ্ধৃত মন্ত্রে বলা হয়েছে,
“একং সদ্ বিপ্রা বহুধা বদন্তি।”
সাধারণ অর্থ, সত্য এক, জ্ঞানীরা তাকে বিভিন্ন নামে অভিহিত করেন।
মন্ত্রটির মূল বৈদিক প্রেক্ষাপট নিয়ে গবেষকদের মধ্যে বিভিন্ন ব্যাখ্যা থাকলেও পরবর্তী হিন্দু দর্শনে এটি বিশেষ তাৎপর্য পেয়েছে। অনেক দার্শনিক ও ব্যাখ্যাকার এই বক্তব্যের মধ্যে এক পরম সত্যকে বিভিন্ন নাম ও রূপে উপলব্ধির সম্ভাবনা দেখেছেন।
অন্যদিকে ছান্দোগ্য উপনিষদের বিখ্যাত উক্তি,
“একং এবাদ্বিতীয়ম”
অর্থাৎ এক ও দ্বিতীয়হীন সত্তার কথা বলে। বেদান্তের বিভিন্ন শাখা এই বক্তব্যকে নিজেদের দর্শনের আলোকে ব্যাখ্যা করেছে।
অর্থাৎ সনাতন চিন্তার একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রবণতা হলো, দৃশ্যমান বৈচিত্র্যের অন্তরালে কোনো এক গভীরতর ঐক্যকে অনুসন্ধান করা।
নিরাকারকে বোঝার মানুষের চেষ্টা
উপনিষদীয় চিন্তায় পরম সত্যকে এমন এক বাস্তবতা হিসেবে ভাবা হয়েছে, যা মানুষের সাধারণ ইন্দ্রিয়, ভাষা ও চিন্তার সীমাকে অতিক্রম করে।
কেন উপনিষদের ভাষায়, যাকে বাক দিয়ে প্রকাশ করা যায় না, বরং যার কারণে বাক প্রকাশের শক্তি লাভ করে।
এখানে একটি গভীর দার্শনিক প্রশ্ন জন্ম নেয়। যদি পরম সত্য মানুষের বোধের অতীত হয়, তবে মানুষ তাকে অনুভব করবে কীভাবে?
মানুষ বিমূর্ত ধারণাকে সহজে ধারণ করতে পারে না। তাই ইতিহাসের প্রায় সব ধর্মীয় সংস্কৃতিতেই কোনো না কোনো প্রতীক তৈরি হয়েছে। পতাকা দেশ নয়, কিন্তু পতাকার দিকে তাকালে দেশকে স্মরণ করা যায়। মানচিত্র পৃথিবী নয়, কিন্তু মানচিত্রের সাহায্যে পৃথিবীকে বোঝা যায়। প্রিয়জনের ছবি মানুষটি নয়, কিন্তু ছবিটি তাকে স্মরণ করিয়ে দেয়।
প্রতিমার ক্ষেত্রেও অনেক হিন্দু ধর্মীয় ধারায় এমন প্রতীকী ও আধ্যাত্মিক সম্পর্কের ব্যাখ্যা পাওয়া যায়।
প্রতিমা কি শুধু মাটি?
একটি মূর্তি তৈরি হয় মাটি, কাঠ, ধাতু বা পাথর দিয়ে। বস্তুগত দৃষ্টিতে সেটি নিঃসন্দেহে একটি জড় বস্তু।
কিন্তু ধর্মীয় উপাসনার পরিসরে বিষয়টি শুধু বস্তুগত থাকে না।
আচার, মন্ত্র, প্রাণপ্রতিষ্ঠা ও ভক্তির মাধ্যমে প্রতিমাকে উপাসনার পবিত্র অবলম্বনে পরিণত করা হয়। কোনো কোনো ধারায় এটিকে দেবতার রূপ হিসেবে দেখা হয়, কোনো ধারায় প্রতীক হিসেবে, আবার কোথাও দেবতার উপস্থিতির পবিত্র আধার হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
এখানেই প্রতিমা আর সাধারণ মূর্তির মধ্যে ধর্মীয় পার্থক্য তৈরি হয়।
তবে এই ব্যাখ্যাও সর্বত্র এক নয়। হিন্দু ধর্মের বিভিন্ন সম্প্রদায় প্রতিমার প্রকৃতি ও মর্যাদা সম্পর্কে ভিন্ন ধারণা পোষণ করে।
রূপের প্রয়োজন কেন?
মানুষের মন দৃশ্যমানতার সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত।
একজন শিশু প্রথমে বর্ণমালা দেখে অক্ষর শেখে। পরে অক্ষরের সীমা অতিক্রম করে ভাষার জগতে প্রবেশ করে। একজন শিক্ষার্থী প্রথমে সূত্র দেখে গণিত বোঝে, পরে সূত্রের অন্তর্নিহিত যুক্তি উপলব্ধি করে।
তেমনি একজন ভক্তের কাছেও প্রতিমা কখনো কখনো আধ্যাত্মিক মনোযোগের একটি কেন্দ্র হয়ে উঠতে পারে।
সরস্বতীর প্রতিমা বিদ্যার কথা মনে করায়, লক্ষ্মী সমৃদ্ধির, দুর্গা শক্তির, কালী সময় ও মৃত্যুর গভীর সত্যের প্রতীক হয়ে উঠতে পারেন। এই অর্থগুলো বিভিন্ন পুরাণ, আচার ও ভক্তি-ঐতিহ্যে নানা উপায়ে প্রকাশ পেয়েছে।
অর্থাৎ প্রতিমার রূপ কেবল সৌন্দর্যের বিষয় নয়; তার সঙ্গে যুক্ত থাকে একটি ধর্মীয় অর্থভাষা।
গীতার দৃষ্টিতে
ভগবদ্গীতার দ্বাদশ অধ্যায়ে ব্যক্তরূপে ঈশ্বরের উপাসনা এবং অব্যক্ত অক্ষর ব্রহ্মের সাধনা উভয়ের কথাই এসেছে।
অব্যক্তের সাধনা সম্পর্কে সেখানে বলা হয়েছে, দেহধারী মানুষের জন্য সেই পথ অধিক কঠিন। এর মাধ্যমে বোঝা যায়, গীতার আলোচনায় উপাসনার একাধিক পথের অস্তিত্ব স্বীকৃত, যদিও তাদের সাধনপদ্ধতি ও কঠিনতার পার্থক্যও উল্লেখ করা হয়েছে।
আবার সপ্তম অধ্যায়ে বিভিন্ন দেবতার উপাসনার প্রসঙ্গ এসেছে। ৭.২০ শ্লোকে কামনার দ্বারা প্রভাবিত মানুষের অন্য দেবতার আশ্রয় নেওয়ার কথা বলা হয়েছে। ৯.২৫ শ্লোকে বিভিন্ন উপাসনার সঙ্গে বিভিন্ন ফল বা গন্তব্যের সম্পর্কের কথা বলা হয়েছে।
এই শ্লোকগুলোর ব্যাখ্যা নিয়ে বিভিন্ন বৈদান্তিক ও ভক্তি-সম্প্রদায়ের মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। তাই একটি শ্লোককে বিচ্ছিন্ন করে সমগ্র হিন্দু ধর্মের চূড়ান্ত মত হিসেবে উপস্থাপন না করাই অধিক যথাযথ।
প্রতিমা পূজা ও পৌত্তলিকতার প্রশ্ন
“মূর্তি পূজা” দেখেই কাউকে পৌত্তলিক বলা সহজ। কিন্তু একটি ধর্মীয় আচারকে বোঝার জন্য তার অনুসারীরা সেই আচারের মধ্যে কী অর্থ খুঁজে পান, সেটিও জানা প্রয়োজন।
একজন ভক্ত যদি প্রতিমার মধ্যে মাটি বা পাথরই শুধু দেখেন, তাহলে সেটি নিছক একটি বস্তু। কিন্তু যদি সেই রূপ তার কাছে দেবতার স্মরণ, ভক্তি, প্রার্থনা ও আত্মশুদ্ধির কেন্দ্র হয়ে ওঠে, তাহলে তার ধর্মীয় অর্থ সম্পূর্ণ ভিন্ন।
এখানে অন্য ধর্মের ক্ষেত্রেও একই নীতি প্রযোজ্য। ধর্মীয় প্রতীককে তার অনুসারীদের নিজস্ব বিশ্বাসের আলোকে বোঝা প্রয়োজন। কোনো প্রতীককে বাইরে থেকে দেখে তার সম্পূর্ণ ধর্মতাত্ত্বিক অর্থ নির্ধারণ করা সবসময় সম্ভব নয়।
বিবেকানন্দের প্রচলিত উপাখ্যান
প্রতিমার প্রতীকী অর্থ বোঝাতে স্বামী বিবেকানন্দকে ঘিরে আলওয়ারের মহারাজার একটি ঘটনা প্রায়ই বলা হয়।
প্রচলিত বর্ণনা অনুযায়ী, মূর্তি পূজা নিয়ে আলোচনার সময় একটি ছবির উদাহরণ দিয়ে তিনি বোঝাতে চেয়েছিলেন, ছবি কাগজ ও রঙের তৈরি হলেও তা মানুষের কাছে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির স্মারক হয়ে উঠতে পারে।
ঘটনাটির বিভিন্ন বর্ণনা প্রচলিত রয়েছে। তাই এটিকে নিশ্চিত ঐতিহাসিক দলিলের পরিবর্তে বহুল প্রচলিত একটি দৃষ্টান্ত হিসেবে উল্লেখ করাই সতর্ক।
তবে দৃষ্টান্তটির ভাবটি সহজ: মানুষ অনেক সময় প্রতীকের মাধ্যমে এমন কিছুকে স্মরণ করে, যা প্রতীকের বস্তুগত অস্তিত্বের বাইরে।
বিসর্জনের দর্শন
দুর্গাপূজার শেষে প্রতিমা বিসর্জনের দৃশ্যটি এই আলোচনাকে আরও গভীর করে।
যে প্রতিমাকে কয়েক দিন ধরে ফুল, ধূপ, প্রদীপ ও প্রার্থনায় সম্মান করা হলো, একসময় সেই প্রতিমাই নদীর জলে বিলীন হয়।
এখানে একটি প্রতীকী দর্শন খুঁজে পাওয়া যায়:
রূপ আসে, রূপ বিলীন হয়; কিন্তু রূপের মধ্য দিয়ে যে বিশ্বাস, স্মৃতি ও আদর্শকে অনুভব করা হয়, তা মানুষের চেতনায় থেকে যায়।
অবশ্য বিসর্জনের আচার ও তার ধর্মতাত্ত্বিক অর্থও সম্প্রদায় ও আচারভেদে ভিন্নভাবে ব্যাখ্যা করা হয়।
শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটি কী?
প্রতিমা পূজার প্রশ্নে হয়তো সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, প্রতিমাটি কী দিয়ে তৈরি তা নয়, বরং তার ধর্মীয় অর্থ কী।
একজন শিল্পীর কাছে এটি শিল্প।
একজন ইতিহাসবিদের কাছে এটি সংস্কৃতির দলিল।
একজন সমাজবিজ্ঞানীর কাছে এটি মানুষের ধর্মীয় আচরণের প্রকাশ।
আর একজন ভক্তের কাছে এটি হতে পারে প্রার্থনা, স্মরণ ও ঈশ্বরের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপনের একটি পবিত্র অবলম্বন।
সনাতন দর্শনের বিভিন্ন ধারায় তাই রূপ ও অরূপ, সাকার ও নিরাকার, প্রতীক ও পরম সত্য নিয়ে দীর্ঘ আলোচনা হয়েছে।
সম্ভবত এখানেই প্রতিমা পূজার সবচেয়ে গভীর দার্শনিক প্রশ্নটি লুকিয়ে আছে:
মানুষ কি মাটির প্রতিমাকে পূজা করছে, নাকি মাটির রূপকে অবলম্বন করে এমন এক অদৃশ্য সত্যের দিকে তাকাচ্ছে, যাকে কোনো একক রূপে সম্পূর্ণ ধারণ করা সম্ভব নয়?
এই প্রশ্নের উত্তর প্রত্যেক দর্শন, সম্প্রদায় ও ভক্তের কাছে এক নয়। আর সেই ভিন্নতাকে স্বীকার করেই প্রতিমা পূজার বিষয়টি সবচেয়ে ন্যায়সংগতভাবে বোঝা সম্ভব।
– আব্দুর রহিম খান, লেখক ও সাংবাদিক




