অধ্যাপক খালিদ ইবনে আমিন।।
জীবনে চলার পথে কত সুরের মুর্ছনায় আমরা আচ্ছন্ন হই। আমরা হারিয়ে যাই চিন্তার অথৈ সাগরে, কল্পনার অনিন্দ্য জগতে, তবুও হাতড়ে ফিরি জীবনের প্রেরণা খুঁজতে। “মানুষ মানুষের জন্য, জীবন জীবনের জন্য, একটু সহানুভূতি কি মানুষ পেতে পারেনা ও বন্ধু” কালজয়ী মানবতাবাদি এই গানের অনিন্দ্য দর্শন ধারণ করে যুগে যুগে কিছু নিভৃতচারি, প্রচার বিমুখ মানুষ মানবতার কল্যাণ সাধনে এগিয়ে এসেছেন আর্তমানবতার সেবায় নিবেদিত প্রাণ হয়ে। অকুন্ঠ চিত্তে পীড়িতের সেবায় মনোনিবেশ করাই হলো মানবতাবাদিদের কাজ।
তেমনি বাংলা ভূখন্ডের এই অঞ্চলে শতাব্দীকাল ব্যাপি মানবতার সেবায় কাজ করে যাচ্ছে আঞ্জুমান মফিদুল ইসলাম। ইতিহাস অনুসন্ধানে জানা যায়,
ভারতবর্ষে ব্রিটিশ সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠায় মুসলিমরা রাষ্টীয় ক্ষমতা হারানোর ফলে, ইংরেজদের ঘৃণা ও বৈরী আচরণে মুসলিম সমাজ দিনে দিনে সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও শিক্ষা-দীক্ষায় ব্যাপক পিছিয়ে পরে এবং সমাজের প্রান্তিক শ্রেণীতে পরিণত হয়। এরই প্রেক্ষিতে, এ অঞ্চলের গরিব, দুঃস্থ ও অসহায় মুসলমানদের সার্বিক উন্নয়নে ভারতের সুরাটের সমাজকর্মী ইব্রাহিম মোহাম্মদ ডুপ্লের নেতৃত্বে ১৯০৫ সালে তৎকালীন মুসলিম নেতৃস্থানীয় দানবীরদের প্রত্যক্ষ সাহায্যে কলকাতায় আঞ্জুমান মুফিদুল ইসলাম প্রতিষ্ঠিত হয়।
১৯৪৭ সালে দেশ ভাগের পর,সেপ্টেম্বর মাসের প্রথম সপ্তাহে পূর্ব পাকিস্তানের রাজধানী ঢাকায় আঞ্জুমান মফিদুল ইসলামের কার্যক্রম শুরু হয়, আঞ্জুমানের প্রধান কর্মকর্তা এস, এম সালাহউদ্দিনের নেতৃত্বে।
সেই থেকে গত ৭৮ বছর ধরে বাংলাদেশ ভূখন্ডে চলছে আঞ্জুমানের মানব সেবা। যুগ যুগ ধরে সমাজের দুঃস্থ, অসহায় ও দরিদ্র মানুষের পাশে নিয়োজিত তাদের এই মানবিক যাত্রায় রয়েছে,
রাজধানীবাসীর জন্য রয়েছে ফ্রি এ্যাম্বুলেন্স সার্ভিস ও বেওয়ারিশ লাশ দাফন কার্যক্রম।
ঢাকা মহানগরী, নারায়নগঞ্জ ও সাভারের নয়টি এতিমখানায় চার শতাধিক এতিম বাচ্চা প্রতিপালন। চারটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ১৭০০ গরীব ছাত্র-ছাত্রীদের অবৈতনিক শিক্ষার সুযোগ। একটি পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট পরিচালনা। দুঃস্থ ও বয়স্ক পুরুষ-মহিলাদের নিয়মিত ভাতা প্রদান। দুঃস্থ মুসলিমদের মাঝে ঈদ সামগ্রী বিতরণ ও বিভিন্ন দুর্যোগে দুর্গত এলাকায় ত্রাণকার্য পরিচালনা।
বিশ্ব এজতেমায় ফ্রি মেডিকেল সার্ভিস প্রদান। এছাড়াও দেশের ৩২টিরও বেশি জেলায় আঞ্চলিক অফিসের মাধ্যমে সেবা কার্যক্রম পরিচালনা করছে আঞ্জুমান।
সম্প্রতি, রাজধানীর কাকরাইলে আঞ্জুমান মুফিদুল ইসলামের নতুন ভবন আঞ্জুমান জে আর টাওয়র উদ্বোধনোত্তর দোয়া ও ইফতার মাহফিলে প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস বলেছেন, বাংলাদেশে বহু প্রতিষ্ঠান রয়েছে। তবে আঞ্জুমান মুফিদুল ইসলাম কেবল মাত্র প্রতিষ্ঠান হিসেবে এতো দীর্ঘমেয়াদে টিকে আছে তা নয়, তারা বেওয়ারিশ লাশ দাফনের পাশাপাশি এতিম শিশুদের লালনপালন করার মধ্যদিয়ে শক্তভাবে তাদের কার্যক্রম পরিচালনা করছে। এমন প্রতিষ্ঠান উপমহাদেশে আর খুঁজে পাওয়া যাবে কি-না আমার জানা নেই। তিনি এও বলেন, বাংলাদেশে আমরা আর কোন বেওয়ারিশ লাশ দেখতে চাইনা। অবশ্যই এ কথার সাথে প্রতিটি বাংলাদেশী একমত।
৯০ কোটি টাকা ব্যয়ে আঞ্জুমান মুফিদুল ইসলামের নতুন ভবন ‘আঞ্জুমান জে আর টাওয়ার’ নির্মাণ করা হয়েছে। এর মধ্যে ভ্যাট মওকুফসহ সরকারি অনুদান ২৬ কোটি টাকা। বাকি ৬৪ কোটি ব্যক্তি পর্যায়ের অনুদান ।
যত দুর্গম ও কঠিন পরিস্থিতি হোক না কেন, আঞ্জুমান মুফিদুল ইসলাম বেওয়ারিশ লাশ দাফন করে এবং সারা দেশ জুড়ে তারা কাজটি করে যাচ্ছে অকুন্ঠ চিত্তে। বিশেষ করে মহামারি ভাইরাস করোনার সময় এ প্রতিষ্ঠানের নাম বারবার এসেছে। বাংলাদেশের ইতিহাস ও মুসলিম সমাজের সঙ্গে মিশে আছে আঞ্জুমান মফিদুল ইসলাম। এটি আমাদের সমাজের একটি ঐতিহ্যবাহী প্রতিষ্ঠান। আমাদের দেশে বহু ধর্মের বিশ্বাসী মানুষের সম্প্রীতিপূর্ণ বসবাস। সকল অসহায় মানুষ, সে যে ধর্মেরই হোক না কেন, সবার তরে এগিয়ে আসতে হবে আঞ্জুমানকে। অন্য ধর্মের বেওয়ারিশ লাশ সৎকারে বিশেষ ব্যবস্থা রাখা যেতে পারে, তাদের ধর্মীয় রীতি অনুসারে। জাতি ধর্ম-বর্ণ, গোত্র নির্বিশেষে সকল মানুষের কল্যাণের জন্য আঞ্জুমান হোক আশা ও ভরশার নির্ভরযোগ্য আশ্রয়স্থল।
