Skip to content
প্রকাশ- November 2, 2026 , 16:54 pm
মুক্তমত

শালীনতার সংকট, শৈশবেই ঘটছে বিপর্যয়

শালীনতার সংকট, শৈশবেই ঘটছে বিপর্যয়

একটি জাতির ভবিষ্যৎ নির্ধারণ হয় তার শিশুদের হাতে। কিন্তু সেই শিশুরাই যদি শৈশব হারিয়ে ফেলে, যদি বয়সের আগেই বড় হয়ে যেতে বাধ্য হয়, তবে সেটি শুধু একটি পরিবারের নয়, পুরো সমাজের ব্যর্থতার প্রতিচ্ছবি।

আজ আমরা এমন এক সময়ে দাঁড়িয়ে আছি, যেখানে শিশুরা খেলনার চেয়ে স্মার্টফোনে বেশি সময় কাটায়, গল্পের বইয়ের বদলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ডুবে থাকে, আর বাস্তব জীবনের শিক্ষা নেওয়ার আগেই ভার্চুয়াল জগত তাদের মানসিকতা গড়ে দিতে শুরু করে। যে বয়সে তাদের স্বপ্ন দেখার কথা, চরিত্র গঠনের কথা, সৃজনশীলতায় বিকশিত হওয়ার কথা, সেই বয়সেই অনেকের মন অকালেই সম্পর্ক, প্রেম ও যৌনতা নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ছে।

Advertisement

প্রশ্ন হলো, এর জন্য দায়ী কে?

শিশুরা তো জন্মগতভাবে এমন নয়। তাদের মন কোমল, নির্মল এবং গ্রহণক্ষম। তারা যা দেখে, যা শোনে, যে পরিবেশে বেড়ে ওঠে, ধীরে ধীরে তাই তাদের চরিত্রে প্রতিফলিত হয়। যদি পরিবারে সময়ের অভাব থাকে, সমাজে শালীনতার চর্চা কমে যায়, আর বিনোদনের নামে অশালীনতাই স্বাভাবিক হয়ে ওঠে, তাহলে তার প্রভাব শিশুদের মনোজগতে পড়বেই।

আজকের পৃথিবীতে একটি শিশু কয়েক সেকেন্ডেই এমন কনটেন্টের মুখোমুখি হতে পারে, যা একসময় প্রাপ্তবয়স্কদের জন্যও অস্বস্তিকর ছিল। অ্যালগরিদম তার বয়স দেখে না, দেখে শুধু তার কৌতূহল। আর সেই কৌতূহলই একসময় অভ্যাসে, অভ্যাস থেকে মানসিকতায় পরিণত হয়।

ইসলাম মানুষের স্বাভাবিক প্রবৃত্তিকে অস্বীকার করেনি। বরং সেটিকে নিয়ন্ত্রণ, পবিত্রতা ও দায়িত্ববোধের মাধ্যমে পরিচালিত করার শিক্ষা দিয়েছে। পবিত্র কোরআনে দৃষ্টি সংযম, লজ্জাশীলতা ও পবিত্র জীবনযাপনের নির্দেশ এসেছে। রাসুল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) যুবসমাজকে আত্মসংযম ও সামর্থ্য হলে বিয়ের মাধ্যমে বৈধ জীবন গঠনের শিক্ষা দিয়েছেন। অর্থাৎ সমস্যার সমাধান কখনো উচ্ছৃঙ্খলতা নয়, বরং নৈতিকতা ও দায়িত্বশীলতা।

দুঃখজনক হলেও সত্য, আমরা আজ সমস্যার কারণ দূর করার চেয়ে সমস্যার শিকার মানুষকে নিয়েই বেশি ব্যস্ত। কোনো কিশোর বা কিশোরীর ভুল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে শুরু হয় উপহাস, ট্রোল আর ব্যঙ্গ। অথচ কেউ প্রশ্ন করে না, কেন সে এমন হলো? তার পাশে দাঁড়ানোর বদলে আমরা তাকে আরও একা করে দিই।

শিশুরা আমাদের কথার চেয়ে কাজ থেকে বেশি শিক্ষা নেয়। বাবা-মা যদি সারাক্ষণ মোবাইলে ডুবে থাকেন, পরিবারে যদি ভালোবাসার পরিবর্তে দূরত্ব বাড়ে, সমাজে যদি অশালীনতা বিনোদনের নামে গ্রহণযোগ্য হয়ে যায়, তবে সন্তানদের কাছ থেকে ভিন্ন কিছু আশা করা কঠিন।

তাই এখনই সময় আত্মসমালোচনার। পরিবারকে সন্তানদের সময় দিতে হবে, তাদের সঙ্গে বন্ধুর মতো কথা বলতে হবে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে শুধু পরীক্ষার ফল নয়, চরিত্র গঠনের প্রতিও সমান গুরুত্ব দিতে হবে। গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দায়িত্বশীল কনটেন্টের প্রসার ঘটাতে হবে। ধর্মীয়, নৈতিক ও মানবিক শিক্ষাকে জীবনের অংশ করে তুলতে হবে।

শালীনতা কোনো পশ্চাৎপদতা নয়, এটি একটি সভ্য সমাজের সৌন্দর্য। আর শৈশব কোনো পরীক্ষাগার নয়, এটি একটি পবিত্র আমানত। এই আমানত রক্ষা করা পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্র সবার দায়িত্ব।

আজ যদি আমরা আমাদের শিশুদের জন্য একটি সুস্থ, নিরাপদ ও শালীন পরিবেশ গড়ে তুলতে না পারি, তাহলে আগামী দিনের সংকট আরও গভীর হবে। কিন্তু যদি আজই দায়িত্বশীল হই, তবে এই শিশুরাই একদিন নৈতিকতা, মানবিকতা ও আদর্শে সমৃদ্ধ একটি সুন্দর সমাজ গড়ে তুলবে।

শৈশবকে রক্ষা করা মানে শুধু একটি শিশুকে রক্ষা করা নয়, বরং একটি জাতির ভবিষ্যৎকে রক্ষা করা।

– আব্দুর রহিম খান, গণমাধ্যম কর্মী

Advertisement