Skip to content
প্রকাশ- November 2, 2026 , 14:21 pm
ফিচার

বিবেকের মৃত্যু হলে রাজনীতিই হয়ে ওঠে লীলাখেলা

বিবেকের মৃত্যু হলে রাজনীতিই হয়ে ওঠে লীলাখেলা

মানুষের সবচেয়ে বড় পরিচয় তার দল নয়, তার বিবেক।
তার সবচেয়ে বড় শক্তি তার কণ্ঠ নয়, সত্যকে সত্য বলার সাহস। আর সবচেয়ে বড় পরাজয় তখনই ঘটে, যখন মানুষ নিজের বিবেককে কোনো ব্যক্তি, দল কিংবা প্রতীকের কাছে বন্ধক রেখে দেয়।

সমাজের ইতিহাসে এমন সময় আসে, যখন অন্যায় আর অন্যায় বলে মনে হয় না। তখন অপরাধীর পরিচয়টাই হয়ে ওঠে অপরাধের বিচারক। কে করেছে, সেটিই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাঁড়ায়; কী করেছে, সেটি আর গুরুত্বপূর্ণ থাকে না।

Advertisement

সেখানেই শুরু হয় নৈতিকতার পতন।

আজকের রাজনৈতিক বাস্তবতার সবচেয়ে বেদনাদায়ক দৃশ্যগুলোর একটি হলো এই দলীয় অন্ধত্ব। নিজের দলের ভুলকে যুক্তি দিয়ে ঢেকে দেওয়া, প্রতিপক্ষের একই ভুলকে অপরাধ হিসেবে চিহ্নিত করা, নিজের নেতার ব্যর্থতাকে কৌশল বলা আর অন্যের ব্যর্থতাকে অযোগ্যতা বলা, এই দ্বিমুখী নৈতিকতা ধীরে ধীরে সমাজের বিবেককে ক্ষয় করে।

অথচ রাজনীতি মানুষের জন্য। মানুষ রাজনীতির জন্য নয়।

রাজনীতি হওয়ার কথা ছিল মানুষের অধিকার রক্ষার ভাষা, রাষ্ট্র পরিচালনার একটি নীতিগত ব্যবস্থা এবং জনকল্যাণের পথ। কিন্তু যখন রাজনীতির কেন্দ্রে আদর্শের পরিবর্তে ক্ষমতা, সেবার পরিবর্তে আধিপত্য এবং যুক্তির পরিবর্তে অন্ধ আনুগত্য জায়গা করে নেয়, তখন রাজনীতি আর জনসেবার প্রতিষ্ঠান থাকে না, হয়ে ওঠে ক্ষমতার খেলাঘর।

আর সেই খেলায় সবচেয়ে সহজে ব্যবহৃত হয় সাধারণ মানুষ।

একজন নেতা ভুল করতে পারেন। একজন জনপ্রতিনিধি দুর্নীতিতে জড়াতে পারেন। একটি দল অন্যায় সিদ্ধান্ত নিতে পারে। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়, তখনও তাদের চারপাশে এমন মানুষ পাওয়া যায় যারা ভুলকে ভুল বলতে ভয় পান। বরং তারা যুক্তি বানান, ব্যাখ্যা বানান, ইতিহাস টেনে আনেন, প্রতিপক্ষের পুরোনো অপরাধের হিসাব খুলে বসেন।

যেন অন্যের অপরাধ আমার অপরাধকে বৈধতা দেয়!

এ এক অদ্ভুত নৈতিক দর্শন।

‘ওরা করেছে, তাই আমরাও করতে পারি।’

এই একটি বাক্যের মধ্যেই সভ্যতার পতনের বীজ লুকিয়ে থাকে।

কারণ অন্যায় কখনো দল দেখে বৈধ হয় না। অন্যায় অন্যায়ই। দুর্নীতি পতাকা দেখে পবিত্র হয় না। সহিংসতা কোনো প্রতীকের ছায়ায় দাঁড়িয়ে ন্যায় হয়ে যায় না। মিথ্যা কোনো নেতার মুখ দিয়ে উচ্চারিত হলে সত্যে পরিণত হয় না।

কিন্তু আমরা প্রায়ই সত্যের চেয়ে পক্ষকে বড় করে দেখি।

আমরা প্রশ্ন করি, ‘কে বলেছে?’

প্রশ্ন করি না, ‘কী বলেছে?’

আমরা দেখি, ‘কোন দলের?’

দেখি না, ‘কথাটি সত্য কি না।’

এভাবেই যুক্তির জায়গা দখল করে পরিচয়। বিবেকের জায়গা দখল করে আনুগত্য। আর নাগরিকের জায়গা দখল করে দলীয় কর্মী।

একটি গণতান্ত্রিক সমাজে সবচেয়ে প্রয়োজনীয় মানুষটি সেই ব্যক্তি, যে নিজের পক্ষের বিরুদ্ধেও সত্য কথা বলতে পারে। কারণ প্রতিপক্ষের সমালোচনা করা সহজ; কঠিন হলো নিজের ঘরের আয়নায় নিজের দলের মুখ দেখে প্রশ্ন তোলা।

যে মানুষ নিজের দলের অন্যায় দেখে চুপ থাকে, সে হয়তো দলের প্রতি বিশ্বস্ত। কিন্তু সে কি সমাজের প্রতি বিশ্বস্ত?

এই প্রশ্নটি আমাদের নিজেদেরই করতে হবে।

রাজনৈতিক দল প্রয়োজন। মতাদর্শ প্রয়োজন। নেতৃত্ব প্রয়োজন। নির্বাচন প্রয়োজন। রাষ্ট্র পরিচালনায় রাজনৈতিক অংশগ্রহণও অপরিহার্য। কিন্তু কোনো কিছুই মানুষের বিবেকের ঊর্ধ্বে নয়।

ইতিহাস বারবার দেখিয়েছে, ব্যক্তি ও দলের ক্ষমতা চিরস্থায়ী নয়। ক্ষমতার চেয়ার বদলায়, পতাকা বদলায়, স্লোগান বদলায়, প্রজন্ম বদলায়। কিন্তু একটি জাতির বিবেক যদি একবার ক্ষয়ে যায়, তার ক্ষত সারতে অনেক সময় লাগে।

তাই আজ সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন রাজনৈতিক শত্রুতা নয়, রাজনৈতিক নৈতিকতা।

প্রয়োজন এমন মানুষ, যিনি নিজের দলের নেতাকে বলতে পারবেন, ‘আপনি ভুল করেছেন।’

প্রয়োজন এমন সাংবাদিক, যিনি ক্ষমতাবানকে প্রশ্ন করবেন, কিন্তু বিরোধী পক্ষের অন্যায়কেও আড়াল করবেন না।

প্রয়োজন এমন নাগরিক, যিনি ভোটের দিন শুধু প্রতীক দেখবেন না, মানুষ ও নীতিও দেখবেন।

প্রয়োজন এমন তরুণ প্রজন্ম, যারা কোনো নেতাকে দেবতা বানাবে না, আবার কোনো রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকেও শত্রু হিসেবে দেখতে শিখবে না।

কারণ নেতা মানুষ। দল মানুষের তৈরি। রাষ্ট্র মানুষের জন্য।

মানুষ যদি মানুষের ওপর দলীয় পরিচয় চাপিয়ে দেয়, তাহলে একসময় দেখা যাবে, আমরা একই দেশের মানুষ হয়েও পরস্পরের কাছে অপরিচিত। তখন প্রতিবেশীর আগে তার রাজনৈতিক পরিচয় জানতে হবে, বন্ধুত্বের আগে তার দল জানতে হবে, সত্য বলার আগে তার পক্ষ জানতে হবে।

এমন সমাজে আইন থাকে, কিন্তু ন্যায় থাকে না। নির্বাচন থাকে, কিন্তু নৈতিকতা থাকে না। রাজনীতি থাকে, কিন্তু জনকল্যাণ থাকে না।

আর তখন রাজনীতিবিদদের লীলাখেলা দেখার জন্য আলাদা কোনো মঞ্চের প্রয়োজন হয় না। পুরো সমাজটাই হয়ে ওঠে সেই মঞ্চ।

তবু আশার জায়গা আছে।

মানুষ এখনো সত্যকে চিনতে পারে। অন্যায় এখনো অন্যায়। বিবেক এখনো পুরোপুরি মৃত নয়। কেবল তাকে জাগিয়ে তুলতে হবে।

আমাদের নতুন কোনো দেবতা দরকার নেই। দরকার নতুন কোনো অন্ধভক্তিও নয়। দরকার এমন নাগরিক চেতনা, যেখানে দল থাকবে কিন্তু দলান্ধতা থাকবে না; নেতা থাকবে কিন্তু ব্যক্তিপূজা থাকবে না; মত থাকবে কিন্তু বিদ্বেষ থাকবে না; বিরোধিতা থাকবে কিন্তু শত্রুতা থাকবে না।

কারণ একটি দেশের মুক্তি কেবল ক্ষমতার পরিবর্তনে আসে না।
মুক্তি আসে চিন্তার পরিবর্তনে।
মুক্তি আসে বিবেকের জাগরণে।

রাজনীতির সবচেয়ে বড় শত্রু কোনো বিরোধী দল নয়। সবচেয়ে বড় শত্রু হলো এমন এক সমাজ, যেখানে মানুষ অন্যায় দেখে নীরব থাকে, সত্য জেনেও মুখ বন্ধ রাখে এবং নিজের পক্ষের অপরাধকে ভালোবাসার নামে ক্ষমা করে দেয়।

সেদিন রাজনীতিবিদরা আর জনগণের প্রতিনিধি থাকেন না, জনগণই হয়ে যায় তাদের খেলনার মতো।

তাই সময়ের সবচেয়ে জরুরি প্রশ্নটি হয়তো এই নয়, কে ক্ষমতায় যাবে?

প্রশ্ন হলো, ক্ষমতায় যে-ই যাক, তাকে প্রশ্ন করার মতো বিবেকবান মানুষ কি আমরা হয়ে উঠতে পারব?

কারণ ক্ষমতার পালাবদল ইতিহাসের নিয়ম।
কিন্তু বিবেকের মৃত্যু কোনো স্বাভাবিক পরিণতি নয়। বিবেককে বাঁচানো যায়। সত্যকে বাঁচানো যায়। সমাজকেও বাঁচানো যায়।

শুধু শর্ত একটাই, আমাদের দলীয় পরিচয়ের আগে মানুষ হতে হবে।

– আব্দুর রহিম খান, লেখক ও সাংবাদিক

Advertisement