স্টাফ রিপোর্টার : জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার এক দিনের মধ্যেই দেশের নিত্যপণ্যের বাজারে এর প্রভাব পড়তে শুরু করেছে। রাজধানীর বাজারে বিভিন্ন ধরনের সবজির দাম কেজিতে ৫ থেকে ১০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে বলে জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা।পরিবহন খরচ বাড়ায় চাল, মাছ, মাংস, ডিম, আলু ও পেঁয়াজসহ অন্যান্য পণ্যের দামও বাড়ার আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
সরকারের নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ২১ সেপ্টেম্বর থেকে ডিজেলের দাম লিটারে ১১৫ টাকা থেকে বেড়ে ১৩৫ টাকা হয়েছে। একইভাবে কেরোসিন ১৩৫ থেকে ১৫৫ টাকা, অকটেন ১৪৫ থেকে ১৬৫ টাকা এবং পেট্রোল ১৪০ থেকে ১৬০ টাকা করা হয়েছে। চলতি বছরে এটি জ্বালানি তেলের দামে তৃতীয় দফা বৃদ্ধি।
জ্বালানি তেলের দাম বাড়ায় সবজি পরিবহন ব্যয়ও বেড়েছে। ঢাকার কারওয়ান বাজারে ময়মনসিংহ, জামালপুর ও টাঙ্গাইল থেকে সবজি আনা আড়তদার মো. খলিলুর রহমান জানান, একেকটি ট্রাকে পরিবহন খরচ কয়েক হাজার টাকা বেড়েছে। ময়মনসিংহ থেকে ঢাকায় একটি ট্রাকের ভাড়া ১৪ হাজার ৫০০ টাকা থেকে বেড়ে ১৮ হাজার ৫০০ টাকা হয়েছে। বাড়তি এই পরিবহন ব্যয় শেষ পর্যন্ত পণ্যের দামের ওপরই পড়বে বলে জানান তিনি।
মানিকগঞ্জ থেকে সবজি আনা পাইকারি ব্যবসায়ী সাইদুর রহমান বলেন, তার একটি পরিবহনের ভাড়া ২ হাজার ৬০০ টাকা থেকে বেড়ে ৩ হাজার ৫০০ টাকা হয়েছে। বাড়তি ব্যয় নিজের পকেট থেকে বহন করা সম্ভব নয়। ফলে এই ব্যয় ক্রেতার কাছ থেকে আদায় করতে হবে। তার হিসাবে, কিছু সবজির দাম কেজিতে প্রায় ১০ টাকা পর্যন্ত বাড়তে পারে।
কেরানীগঞ্জ মডেল টাউনের খুচরা সবজি বিক্রেতা আনোয়ার হোসেন বলেন, জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির কারণে এক দিনের ব্যবধানে বিভিন্ন ধরনের সবজির দাম কেজিতে ৫ থেকে ১০ টাকা বেড়েছে। দাম আরও বাড়তে পারে বলেও জানান তিনি।
কারওয়ান বাজারের খুচরা সবজি বিক্রেতা শাহানাজ বেগম বলেন, আগের দিনের তুলনায় মঙ্গলবার সকালে আড়তেই সবজির দাম বেড়েছে। ফলে কিছুটা লাভ রেখে কেজিতে ৫ থেকে ১০ টাকা বেশি দামে বিক্রি করতে হচ্ছে। তবে নতুন সবজি বাজারে এলে কিছুদিন পর দাম কমতে পারে বলেও জানান তিনি।
ব্যবসায়ীদের ভাষ্য, শুধু সবজি নয়, দূরবর্তী এলাকা থেকে ঢাকাসহ বড় শহরে চাল, মাছ, মাংস, ডিম, আলু ও পেঁয়াজসহ বিভিন্ন পণ্য পরিবহনে ডিজেলনির্ভর যানবাহন ব্যবহার করা হয়। ফলে পরিবহন খরচ বাড়লে উৎপাদনস্থল থেকে পাইকারি বাজার এবং সেখান থেকে খুচরা বাজার পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে বাড়তি ব্যয় যুক্ত হতে পারে।
সিপিডির গবেষক গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির সবচেয়ে বড় ভোগান্তি সাধারণ মানুষের ওপর পড়তে পারে। এর প্রভাব খাদ্যপণ্যের পাশাপাশি খাদ্যবহির্ভূত পণ্যের ওপরও পড়বে। তিনি পরিবহন ভাড়া যৌক্তিক পর্যায়ে রাখা এবং অতিরিক্ত ভাড়া আদায় বন্ধে নজরদারি জোরদারের পরামর্শ দিয়েছেন।
এদিকে বেনাপোল স্থলবন্দরেও জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির পর ট্রাক ভাড়া বেড়েছে। ব্যবসায়ী ও পরিবহনসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য অনুযায়ী, স্থানভেদে ট্রাক ভাড়া ৫ থেকে ৮ হাজার টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। একই সঙ্গে বেসরকারি কনটেইনার ডিপোগুলোতে হ্যান্ডলিং চার্জ গড়ে ৯ দশমিক ৮৫ শতাংশ বাড়ানো হয়েছে।
আমদানি করা পণ্য দেশের বিভিন্ন প্রান্তে পৌঁছাতে এতে বাড়তি খরচ হবে। ব্যবসায়ীরা বলছেন, এই অতিরিক্ত ব্যয় শেষ পর্যন্ত পণ্যের বিক্রয়মূল্যে প্রতিফলিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার পর গণপরিবহনের ভাড়া বাড়ানোর প্রস্তাবও এসেছে। বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) প্রস্তাব অনুযায়ী, দূরপাল্লার বাসে প্রতি কিলোমিটারে ২০ পয়সা এবং শহরের বাসে ১৮ পয়সা ভাড়া বাড়ানোর বিষয়টি সামনে এসেছে। এরই মধ্যে কিছু রুটে নির্ধারিত ভাড়ার চেয়ে বেশি নেওয়ার অভিযোগও পাওয়া গেছে।
অন্যদিকে, দূরপাল্লার বাসে প্রতি কিলোমিটারে ৮ পয়সা এবং সিটি সার্ভিসের বাসে ১০ পয়সা ভাড়া বাড়ানোর প্রস্তাব দিয়েছে বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতি। একই সঙ্গে লঞ্চের ভাড়া প্রতি নটিক্যাল মাইলে ৫ পয়সা বাড়ানোর প্রস্তাব করেছে সংগঠনটি।
বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক এএসএম আহম্মেদ খোকন বলেন, ডিজেলের দাম বাড়ায় ঢাকা-সিলেট ও ঢাকা-চট্টগ্রাম রুটে একটি বাসে শুধু জ্বালানি বাবদ প্রায় ৪ হাজার টাকা বাড়তি খরচ হচ্ছে। সরকারের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ভাড়া সমন্বয় করা হবে বলে জানান তিনি।
জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোর কারণ হিসেবে আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্যবৃদ্ধি ও আমদানি ব্যয়ের চাপের কথা জানিয়েছে সরকার। জ্বালানি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, মার্চ থেকে আগস্ট সময়ে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেল ও জাহাজভাড়া বৃদ্ধির কারণে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) বড় ধরনের লোকসান হয়েছে। বিভাগের হিসাবে, বর্তমান আন্তর্জাতিক বাজারমূল্যে ডিজেলে বিপিসির লিটারপ্রতি লোকসান প্রায় ৮৯ টাকা।
বিদ্যুৎ ও জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত বলেন, জ্বালানি তেলের দাম সমন্বয় না করলে সরকারের টিকা কর্মসূচি, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি ও কম মূল্যে খাদ্য সরবরাহের মতো কার্যক্রমে ব্যাঘাত ঘটতে পারত। জনগণের ওপর এর প্রভাবের বিষয়টি স্বীকার করে তিনি বলেন, পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে জ্বালানি তেলের দাম আবার সমন্বয় করে আগের পর্যায়ে বা তার চেয়েও কমিয়ে আনার চেষ্টা করা হবে।
বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম বাড়লে দেশের অর্থনীতিকেও সেই চাপ বহন করতে হয়। নিত্যপণ্যের সরবরাহ ও মূল্য পরিস্থিতি স্থিতিশীল রাখতে বাজার নজরদারি জোরদারের কথা জানান তিনি। অযৌক্তিকভাবে পণ্যের দাম বাড়ানো বা অতিরিক্ত মুনাফার চেষ্টা হলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও জানান তিনি।
অর্থনীতিবিদদের মতে, জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির প্রভাব শুধু পণ্যের বাজারে সীমাবদ্ধ থাকবে না। পরিবহন, কৃষি, উৎপাদন ও সরবরাহ ব্যয় বাড়লে পরিবারের দৈনন্দিন ব্যয়ও বাড়তে পারে। আয় একই থাকলে মানুষের প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। সীমিত আয়ের পরিবারগুলোতে এর প্রভাব তুলনামূলক বেশি হতে পারে।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞ এম শামসুল আলমও মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছেন। তার বক্তব্য অনুযায়ী, মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমে গেলে সরকার জ্বালানি খাত থেকে যে রাজস্ব বা ভর্তুকি-সংক্রান্ত সুবিধা পাওয়ার আশা করছে, তার ওপরও প্রভাব পড়তে পারে।
জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির প্রথম ধাক্কা ইতোমধ্যে পরিবহন ও নিত্যপণ্যের বাজারে দেখা দিয়েছে। উৎপাদন, পরিবহন ও বিপণনের বিভিন্ন ধাপ পেরিয়ে এই বাড়তি ব্যয় নিত্যপণ্যের খুচরা বাজারে কতটা প্রভাব ফেলে, তা এখন দেখার বিষয়। বিশেষ করে দূরবর্তী এলাকা থেকে শহরের বাজারে আসা সবজি, মাছ, মাংস ও চালের ওপর দ্রুত প্রভাব পড়ার আশঙ্কা করছেন ব্যবসায়ীরা।
