Skip to content
প্রকাশ- November 2, 2026 , 15:11 pm
অন্যান্য

বিএনপির ঘরে মনোনয়ন যুদ্ধ, বাইরে সুযোগের অপেক্ষায় জামায়াত-এনসিপি

বিএনপির ঘরে মনোনয়ন যুদ্ধ, বাইরে সুযোগের অপেক্ষায় জামায়াত-এনসিপি

হৃদয় আহম্মেদ, স্টাফ রিপোর্টারঃ

কবে হবে জামালপুর পৌরসভার নির্বাচন, তা এখনো নিশ্চিত নয়। নির্বাচন কমিশনও ঘোষণা করেনি কোনো তফসিল। অথচ সম্ভাব্য মেয়র প্রার্থীদের দৌড়ঝাঁপে এরই মধ্যে সরগরম হয়ে উঠেছে শহরের রাজনীতি। গণসংযোগ, কর্মীসভা, উঠান বৈঠক, সামাজিক অনুষ্ঠান ও রাজনৈতিক কর্মসূচিতে অংশ নেওয়ার পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও নিজেদের অবস্থান জানান দিচ্ছেন সম্ভাব্য প্রার্থীরা। তফসিল না থাকলেও তাই বাড়ছে নির্বাচনী আবহ।

Advertisement

পরবর্তী মেয়র কে হবেন এ প্রশ্নকে ঘিরে বিএনপির একাধিক নেতার নাম আলোচনায় রয়েছে। দলটির বিভিন্ন বলয়ের সম্ভাব্য প্রার্থীদের তৎপরতায় মনোনয়ন ঘিরে তৈরি হয়েছে প্রতিযোগিতা। অন্যদিকে বিএনপির এই অভ্যন্তরীণ প্রতিদ্বন্দ্বিতাকে নিজেদের জন্য সুযোগ হিসেবে দেখছে জামায়াতে ইসলামী, জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)সহ অন্যান্য দল। তারাও নিজেদের প্রার্থী ও সাংগঠনিক অবস্থান শক্ত করার চেষ্টা করছে।

৯৬ হাজার ভোটারের পৌরসভা

পৌরসভার তথ্য অনুযায়ী, প্রথম শ্রেণির জামালপুর পৌরসভার আয়তন ৫৩ দশমিক ২৮ বর্গকিলোমিটার। জনসংখ্যা ১ লাখ ৫৮ হাজার ৮৮৯ জন। মোট ভোটার ৯৬ হাজার ৩৫৭ জন। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার ৪৬ হাজার ৯১৩ এবং নারী ভোটার ৪৯ হাজার ৪৪৪ জন।

পৌরসভায় রয়েছে ১২টি ওয়ার্ড, ৭৬টি মহল্লা ও ৪২টি ভোটকেন্দ্র। প্রায় এক লাখ ভোটারের এই পৌরসভায় মেয়র পদে জয় পেতে দলীয় সাংগঠনিক শক্তির পাশাপাশি ব্যক্তিগত গ্রহণযোগ্যতা ও ওয়ার্ডভিত্তিক ভোটের হিসাবও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

বিএনপিতে অন্তত ৮-১০ সম্ভাব্য প্রার্থী

দলীয় সূত্র ও স্থানীয় নেতাকর্মীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বিএনপি থেকে অন্তত ৮ থেকে ১০ জন নেতা সম্ভাব্য মেয়র প্রার্থী হিসেবে মাঠে সক্রিয় রয়েছেন। তবে সবচেয়ে বেশি আলোচনায় রয়েছেন জেলা যুবদলের সদস্য সচিব সোহেল রানা খান ও শহর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক শাহ মোহাম্মদ মাসুদ।

তাদের অনুসারীরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, পোস্টার, ব্যানার, গণসংযোগ ও বিভিন্ন কর্মসূচির মাধ্যমে নিজেদের প্রার্থীর পক্ষে প্রচার চালাচ্ছেন। সোহেল রানা খানকে তরুণ কর্মীদের মধ্যে সক্রিয় ও সাংগঠনিকভাবে দৃশ্যমান নেতা হিসেবে দেখছেন তৃণমূলের অনেকে। অন্যদিকে শাহ মোহাম্মদ মাসুদও দলীয় কর্মসূচি ও মাঠ পর্যায়ে নেতাকর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়িয়েছেন।

এ ছাড়া জিএস ফিরোজ আহমেদ, রিশাদ রোদোয়ান বাবু, শামীম আহমেদ, শুভ পাঠানসহ আরও কয়েকজনের নাম সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে আলোচনায় রয়েছে। একাধিক প্রার্থী মাঠে থাকায় বিএনপির ভেতরেই মনোনয়ন ঘিরে প্রতিযোগিতা তীব্র হচ্ছে।

৫ আগস্টের পর যে বিরোধ প্রকাশ্যে

২০২৪ সালের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর জামালপুর জেলা বিএনপির অভ্যন্তরে নেতৃত্ব ও সাংগঠনিক অবস্থান নিয়ে নানা মতবিরোধ প্রকাশ্যে আসে। জেলা কমিটি গঠনকে কেন্দ্র করে পাল্টাপাল্টি অবস্থান, বিক্ষোভ, মশাল মিছিল ও সংঘর্ষের ঘটনাও ঘটেছে।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিভিন্ন নেতার বক্তব্য, অডিও-ভিডিও বার্তা, অভিযোগ ও পাল্টা অভিযোগের কারণে দলটির অভ্যন্তরীণ মতপার্থক্য আরও দৃশ্যমান হয়।

দলীয় সূত্রের ভাষ্য, জেলা পর্যায়ের নেতৃত্ব, সাবেক পদধারী নেতা, নতুন প্রজন্মের নেতৃত্ব এবং কেন্দ্রীয় নেতাদের অনুসারীদের মধ্যে প্রভাব বিস্তারকে কেন্দ্র করেই এসব বিভাজন তৈরি হয়েছে। এখন পৌর নির্বাচন সামনে আসায় প্রার্থী মনোনয়নকে কেন্দ্র করে সেই প্রতিদ্বন্দ্বিতা নতুন করে সক্রিয় হতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

তবে বিএনপির সম্ভাব্য প্রার্থীদের কেউ কেউ অভ্যন্তরীণ কোন্দলের বিষয়টি অস্বীকার করে এটিকে স্বাভাবিক রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা হিসেবে দেখছেন।

বিএনপির প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নজর অন্য দলগুলোর

বিএনপির সম্ভাব্য প্রার্থীদের একাধিক বলয়ে সক্রিয়তার মধ্যে জামায়াতে ইসলামী ও এনসিপিও নিজেদের অবস্থান শক্ত করার চেষ্টা করছে।

জামায়াতে ইসলামী থেকে মেয়র প্রার্থী হিসেবে অ্যাডভোকেট মুজিবুর রহমানের নাম আলোচনায় রয়েছে। দলটি নিজেদের সাংগঠনিক শক্তি ও প্রার্থীর গ্রহণযোগ্যতাকে সামনে রেখে মাঠ গোছাচ্ছে।

অন্যদিকে এনসিপিও তরুণ ভোটারদের গুরুত্ব দিয়ে নির্বাচনের প্রস্তুতি নিচ্ছে। দলীয় সূত্রে আবিদ সৌরভকে সম্ভাব্য মেয়র প্রার্থী হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। পৌরসভার নাগরিক সেবা অনলাইনে আনা, তরুণদের সম্পৃক্ত করা ও আধুনিক পৌর ব্যবস্থাপনার বিষয়গুলোকে গুরুত্ব দিচ্ছে দলটি।

এ ছাড়া ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশও এককভাবে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে বলে জানা গেছে। স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবেও কয়েকজন পরিচিত মুখের নাম আলোচনায় রয়েছে।

বিএনপি শেষ পর্যন্ত একক প্রার্থী দিতে পারে কি না, নাকি একাধিক প্রার্থী মাঠে থাকবেন তার ওপর নির্বাচনের সমীকরণ অনেকটাই নির্ভর করবে বলে মনে করছেন স্থানীয় রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা। বিএনপির ভোট ভাগ হলে অন্য দলগুলোর প্রার্থীরা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় বাড়তি সুবিধা পেতে পারেন এমন হিসাবও রয়েছে।

দল নয়, নাগরিক সমস্যা চান ভোটাররা

সম্ভাব্য প্রার্থীদের তৎপরতা বাড়লেও ভোটারদের আলোচনায় উঠে আসছে শহরের নাগরিক সমস্যা। যানজট, জলাবদ্ধতা, ড্রেনেজ, পরিচ্ছন্নতা, পানি সরবরাহ, রিকশার নিয়ন্ত্রণ ও কর্মসংস্থানের মতো বিষয়গুলোকে গুরুত্ব দিচ্ছেন তারা।

শহরের নতুন ভোটারদের অনেকে বলছেন, এবার শুধু দলীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে নয়, প্রার্থীর ব্যক্তিগত গ্রহণযোগ্যতা, অতীত ভূমিকা ও নির্বাচনী পরিকল্পনা বিবেচনা করতে চান।

পাথালিয়ার ভোটার মোতালেব মিয়া বলেন, ভোটের আগে প্রার্থীরা মানুষের কাছে এলেও নির্বাচনের পর অনেক প্রতিশ্রুতিই আর বাস্তবায়ন হয় না। শহরের দীর্ঘদিনের পানি সমস্যার সমাধান চান তারা।

শহরের রিকশাচালক ফুলু শেখ বলেন, অতিরিক্ত রিকশার কারণে শহরে চলাচলে সমস্যা হচ্ছে। রিকশা নিয়ন্ত্রণে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে পারবেন এমন মেয়র চান তারা।

তফসিল না হলেও মাঠে প্রস্তুতি

এখনো নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা না হওয়ায় সম্ভাব্য প্রার্থীদের তৎপরতা মূলত নিজেদের রাজনৈতিক অবস্থান শক্ত করার পর্যায়েই রয়েছে। তফসিল ঘোষণার পর দলীয় মনোনয়ন, প্রার্থী চূড়ান্তকরণ এবং জোট বা সমঝোতার বিষয়গুলো সামনে আসবে।

তবে এরই মধ্যে বিএনপি, জামায়াত, এনসিপি ও ইসলামী আন্দোলনের সম্ভাব্য প্রার্থীদের তৎপরতায় স্পষ্ট হচ্ছে, নির্বাচন ঘিরে রাজনৈতিক প্রস্তুতি শুরু হয়ে গেছে। বিএনপি একক প্রার্থী দিতে পারলে এক ধরনের সমীকরণ তৈরি হবে। আর একাধিক প্রার্থী মাঠে থাকলে ভোট ভাগের সুযোগ নিতে পারে অন্য দলগুলো।

শেষ পর্যন্ত কে দলীয় মনোনয়ন পান, কার পক্ষে কতটা সাংগঠনিক শক্তি কাজ করে এবং ভোটাররা দলীয় পরিচয়ের বাইরে কোন প্রার্থীকে গ্রহণ করেন সেটিই নির্ধারণ করবে জামালপুর পৌর নির্বাচনের চূড়ান্ত চিত্র।

যা বলছেন সম্ভাব্য প্রার্থীরা

বিএনপির সম্ভাব্য মেয়র প্রার্থী শাহ মোহাম্মদ মাসুদ বলেন, ‘বিগত ১৭ বছর আন্দোলন-সংগ্রামে আমি সরাসরি মাঠে ছিলাম। দল যখন যে কর্মসূচি দিয়েছে, আমি আমার সংগঠন ও নেতাকর্মীদের নিয়ে রাজপথে ছিলাম। আন্দোলন-সংগ্রামের কারণে আমি জামালপুর জেলার রাজনীতিতে সর্বোচ্চ মামলার আসামিদের একজন। তাই আমি শতভাগ আশাবাদী যে দল আমার ত্যাগ ও ভূমিকার মূল্যায়ন করবে।’

তিনি বলেন, ‘পৌরসভার সবচেয়ে বড় সমস্যা হচ্ছে ড্রেনেজ ব্যবস্থা ও পানি নিষ্কাশন। দল যদি আমাকে মনোনয়ন দেয় এবং জনগণ নির্বাচিত করে, তাহলে এই সমস্যার সমাধানকেই সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেব।’

বিএনপির অভ্যন্তরীণ বিভক্তির বিষয়ে শাহ মাসুদ বলেন, ‘বিএনপির মধ্যে এখন কোনো কোন্দল নেই। এখানে একাধিক প্রার্থী থাকাটা স্বাভাবিক এবং এটাকে আমি প্রতিযোগিতা হিসেবেই দেখি। অতীতে কিছু মতপার্থক্য থাকলেও এখন সবাই দলকে শক্তিশালী করার জন্য কাজ করছে।’

বিএনপির সম্ভাব্য মেয়র প্রার্থী ও জেলা যুবদলের সদস্য সচিব সোহেল রানা খান বলেন, ‘জামালপুর পৌরসভার উন্নয়ন, নাগরিক সেবার মানোন্নয়ন এবং একটি আধুনিক, পরিচ্ছন্ন ও পরিকল্পিত শহর গড়ে তোলার লক্ষ্য নিয়েই আমি দীর্ঘদিন ধরে মানুষের পাশে আছি। দল যদি আমাকে মনোনয়ন দেয়, তাহলে জনগণের প্রত্যাশাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে কাজ করব।’

তিনি বলেন, ‘পৌরসভার সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জগুলোর মধ্যে রয়েছে জলাবদ্ধতা, ড্রেনেজ সংকট, যানজট, পরিচ্ছন্নতা এবং কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি। নির্বাচিত হলে এসব সমস্যা সমাধানে বাস্তবভিত্তিক ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করা হবে। আমি জয়ের ব্যাপারে শতভাগ আশাবাদী।’

জামায়াতে ইসলামীর সম্ভাব্য মেয়র প্রার্থী অ্যাডভোকেট মুজিবুর রহমান বলেন, ‘আলহামদুলিল্লাহ, আমরা জয়ের ব্যাপারে আশাবাদী। তবে নির্বাচনকে আমরা শুধু জয়-পরাজয়ের হিসাব হিসেবে দেখছি না। জনগণের আস্থা অর্জন করাই আমাদের মূল লক্ষ্য। ২৪-এর গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে গণমানুষের রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষায় পরিবর্তন এসেছে। তারা এখন নেতা নির্বাচনের চেয়ে সৎ, দক্ষ ও যোগ্য সেবককে মেয়র হিসেবে পছন্দ করেন।’

তিনি বলেন, ‘বিএনপির অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি বা তাদের কোনো দুর্বলতাকে কেন্দ্র করে রাজনীতি করা আমাদের উদ্দেশ্য নয়। আমরা আমাদের সাংগঠনিক শক্তি, প্রার্থীর গ্রহণযোগ্যতা এবং জনগণের কাছে আমাদের কর্মসূচি ও অঙ্গীকার তুলে ধরেই ভোট চাইব।’

এনসিপির সম্ভাব্য মেয়র প্রার্থী আবিদ সৌরভ বলেন, ‘আমি এনসিপি থেকে নির্বাচন করার প্রস্তুতি নিচ্ছি। জামালপুরকে আধুনিক ও তরুণবান্ধব পৌরসভা হিসেবে গড়ে তুলতে ৩৬ দফা পরিকল্পনা ঘোষণা করেছি। এর মধ্যে পৌরসভার বিভিন্ন নাগরিক সেবা অনলাইনে আনার বিষয়টি অগ্রাধিকার পাবে।’

তিনি বলেন, ‘তরুণদের নিয়েই আমি কাজ করতে চাই। আমার বিশ্বাস, তরুণ প্রজন্ম ও সাধারণ মানুষ যদি প্রার্থীদের কাজ ও পরিকল্পনা বিবেচনা করেন, তাহলে আমি ভালো অবস্থানে থাকব।’

জোটের বিষয়ে আবিদ সৌরভ বলেন, ‘নির্বাচনে এককভাবে নাকি জোটগতভাবে অংশ নেওয়া হবে, সেটি দলীয় সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করবে। দল যে সিদ্ধান্ত নেবে, আমরা সেভাবেই এগোব।’

জামালপুর জেলা নির্বাচন অফিসার মুহাম্মদ আনোয়ারুল হক বলেন, ‘এখনো স্থানীয় কোনো নির্বাচনে তফসিল ঘোষণা হয়নি। যেটুকু বলতে পারি, আগে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন হবে। পরে পৌরসভাসহ বাদবাকি নির্বাচনগুলো হবে। তাই পৌর নির্বাচনের তফসিলের পরই এটির কার্যক্রম শুরু হবে।’

 

Advertisement