Skip to content
প্রকাশ- November 2, 2026 , 16:54 pm
অন্যান্য

জামালপুরের ৫ আসনে চূড়ান্ত ভোটযুদ্ধ: মুখোমুখি বিএনপি–জামায়াত,

জামালপুরের ৫ আসনে চূড়ান্ত ভোটযুদ্ধ: মুখোমুখি বিএনপি–জামায়াত,

Oplus_131072

সংসদীয় ৫ টি আসনের ২ টিতে বিএনপি ও ১ টিতে জামায়াত এগিয়ে, হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের আভাস ২ টিতে

আতিকুর রহমান আতিক :
আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে জামালপুরের পাঁচটি সংসদীয় আসনে নির্বাচনী উত্তাপ তুঙ্গে উঠেছে। আওয়ামী লীগ নির্বাচনী মাঠে না থাকায় স্বাধীনতার পর এই প্রথম জেলার সব আসনেই প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে সরাসরি মুখোমুখি অবস্থানে দাঁড়িয়েছে বিএনপি ও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। পাঁচ আসনে মোট ৩২ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করলেও কার্যত ভোটের মূল লড়াই সীমাবদ্ধ থাকছে এই দুই দলের মধ্যেই। তবে বিপুলসংখ্যক ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্র, পারস্পরিক অভিযোগ–পাল্টা অভিযোগ এবং নিরাপত্তা শঙ্কা নির্বাচনকে ঘিরে উদ্বেগ বাড়িয়েছে।

Advertisement

জামালপুরের সামগ্রিক নির্বাচনী চিত্র:

জামালপুর জেলার ৭ উপজেলা, ৮ পৌরসভা ও ৬৮ ইউনিয়নে মোট ৬২৩টি ভোটকেন্দ্র রয়েছে। প্রশাসনের হিসাবে—
অধিক ঝুঁকিপূর্ণ ১২২টি (১৯.৬%),ঝুঁকিপূর্ণ ২১২টি (৩৪%), সাধারণ ২৮৯টি (৪৬.৪%)। সবচেয়ে বেশি ভোটকেন্দ্র রয়েছে জামালপুর–৫ (সদর) আসনে—১৬১টি। সবচেয়ে কম ভোটকেন্দ্র জামালপুর–৪ (সরিষাবাড়ী) আসনে—৮৮টি। ঝুঁকির বিবেচনায়ও সদর আসন সবচেয়ে নাজুক; এখানে ৫৫টি কেন্দ্র অধিক ঝুঁকিপূর্ণ এবং ৭৫টি ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত। আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি জামালপুরের মোট ২১ লাখ ১২ হাজার ১৮৭ জন ভোটার তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করবেন।
ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্র নিয়ে পাল্টাপাল্টি অভিযোগ
ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্র ইস্যুতে বিএনপি ও জামায়াত একে অপরকে দোষারোপ করছে। দুই পক্ষই আশঙ্কা প্রকাশ করেছে যে, নির্বাচনী সহিংসতা বা কেন্দ্র দখলের চেষ্টা হতে পারে।

জামালপুর জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক ও সদর–৫ আসনের প্রার্থী অ্যাডভোকেট শাহ ওয়ারেছ আলী মামুন গণমাধ্যমকে বলেন,“গত ১৭ বছর জনগণের ভোটের অধিকার নিয়ে আন্দোলন করেছে বিএনপি। তাই জনগণ এবার বিএনপিকেই সমর্থন দেবে। জেলার প্রতিটি ইউনিয়ন ও ওয়ার্ডে আমাদের নেতা–কর্মীরা মাঠে সক্রিয় রয়েছেন। আমরা বিশ্বাস করি, পাঁচটি আসনেই বিএনপি বিপুল ভোটে জয়ী হবে।”

জামালপুর জেলা জামায়াতের সেক্রেটারি ও সরিষাবাড়ী–৪ আসনের প্রার্থী মো. আব্দুল আওয়াল বলেন,
“নির্বাচন সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ হলে বিএনপির পরাজয় নিশ্চিত—এটা তারা নিজেরাই বুঝতে পারছে। সেই কারণেই তারা অতীতের মতো ফ্যাসিবাদী কায়দা অবলম্বনের চেষ্টা করছে, যা খুবই দুঃখজনক। তাদের আচরণের কারণেই কেন্দ্রগুলো ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে।”তিনি আরও বলেন,
“ভোটাররা এখনও নিশ্চিত নন যে তারা স্বাধীনভাবে ভোট দিতে পারবেন কি না। তবে সুষ্ঠু ভোট হলে সাধারণ মানুষ জামায়াতকে ভোট দেবে এবং আমাদের প্রার্থীরা পাঁচটি আসনেই জয়ী হবেন।”

প্রশাসনের প্রস্তুতি ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা:
জামালপুরের পুলিশ সুপার ড. চৌধুরী মো. যাবের সাদেক গণমাধ্যমকে বলেন,
“একটা বিষয় খুব পরিষ্কার—এবার অস্ত্রবাজি, কেন্দ্র দখল বা ভোট ডাকাতির দিন শেষ। কেউ যদি এমন চিন্তা করে, সেটা তার দূরস্বপ্ন। আমরা যেকোনো পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রস্তুত আছি।”
জেলা রিটার্নিং কর্মকর্তা ও জেলা প্রশাসক মো. ইউসূফ আলী গণমাধ্যমকে বলেন,
“কেন্দ্রভিত্তিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা ইতোমধ্যে নেওয়া হয়েছে। ভোটাররা যেন নির্বিঘ্নে ভোট দিতে পারেন, সে জন্য মাঠে পর্যাপ্ত সেনাবাহিনী, বিজিবি, পুলিশ, ব্যাটালিয়ন আনসার ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মোতায়েন থাকবে। আমরা আশা করি, জামালপুরে একটি সুষ্ঠু ও সুন্দর নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে।”

আসনভিত্তিক বিস্তারিত চিত্র:
জামালপুর–১(দেওয়ানগঞ্জ–বকশীগঞ্জ),ভোটার ৪,৩১,৭০৭ জন,
বিএনপি মনোনীত- এম রশিদুজ্জামান মিল্লাত,
জামায়াত মনোনীত – নাজমুল হক সাঈদী এবং
ইসলামী আন্দোলন মনোনীত – আব্দুর রউফ তালুকদার,
জাতীয় পার্টি: একেএম ফজলুল হক,গণঅধিকার পরিষদ: মো. রফিকুল ইসলাম। সাবেক এমপি মিল্লাত সীমান্তবর্তী অবহেলিত এলাকায় যোগাযোগ অবকাঠামোসহ উন্নয়নমূলক কাজ করায় জনপ্রিয়। তবে স্থানীয় বিএনপির কিছু সুবিধাবাদী নেতাকর্মীর জন্য তার জনপ্রিয়তার ভাটা পড়ছে বলে অনেকে মন্তব্য করেছেন। ভোটারদের মতে, এখানে মূল লড়াই হবে বিএনপি–জামায়াত–ইসলামী আন্দোলনের মধ্যে। স্থানীয়দের মতে, হাড্ডাহাড্ডি লড়াই হবে বিএনপি ও জামায়াতের মধ্যে। তারা মনে করেন, হাতপাখা যতো বেশি ভোট টানবে ততোটাই এগিয়ে থাকবে নাজমুল হক সাঈদি।

জামালপুর–২ (ইসলামপুর)
ভোটার: ২,৮২,০৮৮,
বিএনপি মনোনীত প্রার্থী সাবেক এমপি সুলতান মাহমুদ বাবু,জামায়াত মনোনীত ড. অধ্যক্ষ ছামিউল হক ফারুকী, ইসলামী আন্দোলনের সুলতান মাহমুদ,স্বতন্ত্র অর্ণব ওয়ারেছ খান। ২০০১ সালে বাবু বিপুল ভোটে জয়ী হয়েছিলেন এবং নদীভাঙন রোধসহ ব্যাপক উন্নয়ন করেছিলেন। তবে পশ্চিম ইসলামপুরের ৬ ইউনিয়নে জামায়াতের শক্ত অবস্থান থাকায় এ আসনে জামায়াত কিছুটা এগিয়ে আছেন বলে ভোটাররা মনে করছেন।

জামালপুর–৩ (মেলান্দহ–মাদারগঞ্জ) ভোটার ৫,৩৯,৫০৩,প্রার্থী ৯ জন,বিএনপি মনোনীত মোস্তাফিজুর রহমান বাবুল,জামায়াতের মজিবুর রহমান আজাদী,জাতীয় পার্টি মীর শামসুল ইসলাম,ইসলামী আন্দোলনের দৌলতুজ্জামান আনছারী,গণসংহতি আন্দোলনের ফিদেল নঈম, গণঅধিকার পরিষদের লিটন মিয়া, হেভিওয়েট স্বতন্ত্র প্রার্থী ২ জন, সাদিকুর রহমান এবং শিবলুল বারী রাজু,জামালপুর জেলার একমাত্র নারী স্বতন্ত্র প্রার্থী ফারজানা ফরিদ।
এই আসন দীর্ঘদিন আওয়ামী লীগের ঘাঁটি ছিল। মির্জা আজম টানা ৭ বার এমপি ছিলেন। আওয়ামী লীগ না থাকায় ভোটের হিসাব বদলে গেছে। এখানে মূল লড়াই হবে বিএনপি, জামায়াত ও এক স্বতন্ত্র প্রার্থীর মধ্যে। তবে বিদ্রোহী প্রার্থী বিএনপির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। স্থানীয়দের মতে, দুই হেভিওয়েট স্বতন্ত্র প্রার্থী সাদিক ও রাজু অনেক বেশি ভোট টানবে বিধায় বড় চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারে বিএনপি। তবে এ আসনে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই হবে বলে অনেকেই মনে করছেন।

জামালপুর–৪ (সরিষাবাড়ী)
ভোটার ৩,০৪,৯৯২ জন,
বিএনপি মনোনীত প্রার্থী ফরিদুল কবির তালুকদার শামীম, জামায়াত মনোনীত মোহাম্মদ আব্দুল আওয়াল, গণঅধিকার পরিষদ ইকবাল হোসেন,নাগরিক ঐক্যের কবির হাসান, ইসলামী আন্দোলন আলী আকবর, কমিউনিস্ট পার্টির মাহবুব জামান জুয়েল। সরিষাবাড়ী বিএনপির শক্ত ঘাঁটি।শামীম তালুকদারের পারিবারিক ও ব্যক্তিগত গ্রহণযোগ্যতা বিজয়ের কারণ হতে পারে বলে দলীয় নেতাকর্মী মনে করছেন। উপজেলা বিএনপির সহসভাপতি জাহাঙ্গীর কবির মুক্তকালকে বলেন, ‘ আমরা জয়ের ব্যাপারে শতভাগ আশাবাদী’,তিনি আরও বলেন, ‘২ লক্ষ ভোটের ব্যবধানে এ আসনে ধানের শীষ বিজয়ী হবে’। কাস্টিং ভোটের কতভাগ পেতে পারেন জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘কাস্টিং ভোটের ৮০% ভোট আমরা পাব’। অপরপক্ষে এ আসনের জামায়াত মনোনীত প্রার্থীর আসন পরিচালক ও জেলা শ্রমিককল্যাণ ফেডারেশনের সভাপতি এড. আছিমুল ইসলাম মুক্তকালকে বলেন, ‘ দীর্ঘ ১৬ বছর পর ফ্যাসিবাদের কবর রচনা হয়েছে, বাংলাদেশের মানুষ নতুন করে আর কোন ফ্যাসিবাদ দেখতে চাই না, সারা বাংলাদশে জামায়াতের পক্ষে যে সাড়া সৃষ্টি হয়েছে এই প্রেক্ষাপটে আমরা শতভাগ বিজয়ের আশাবাদী’
স্থানীয়দের মতে, ভোটের বর্তমান পরিস্থিতি অনুযায়ী শামীম তালুকদার এগিয়ে রয়েছেন তবে কিছু ভোটারের নিরবতা ১২ তারিখের হিসাব পাল্টে দিতে পারে।

জামালপুর–৫ (সদর)ভোটার ৫,৭৬,৮০৮ জন,বিএনপি মনোনীত প্রার্থী অ্যাডভোকেট শাহ মো. ওয়ারেছ আলী মামুন,জামায়াতের মুহাম্মদ আব্দুস সাত্তার,ইসলামী আন্দোলন মনোনীত সৈয়দ ইউনুছ আহাম্মদ,জাতীয় পার্টি মো. বাবর আলী খান,গণঅধিকার পরিষদের জাকির হোসেন,জেএসডি মো. আমির উদ্দিন,কমিউনিস্ট পার্টির শেখ মো. আক্কাছ আলী,স্বতন্ত্র: মাসুদ ইব্রাহিম, হোছনেয়ারা বেগম। সদর আসনে মূল লড়াই হবে বিএনপি–জামায়াতের মধ্যে। ওয়ারেছ আলী মামুন তার ব্যক্তিগত ভাবমূর্তি ও সাংগঠনিক শক্তির কারণে এগিয়ে আছেন আছেন বলে স্থানীয়রা মনে করছেন । জামায়াতের দাবি, বিএনপির বিরামহীন চাঁদাবাজি, দূর্নীতি ও দখলদারির জন্য মানুষ পরিবর্তনের পক্ষে দাড়ি পাল্লাকেই বেছে নিবেন।
সামগ্রিক বিশ্লেষণ
জামালপুরের পাঁচটি আসনের মধ্যে জামালপুর-৪,৫ বিএনপি এগিয়ে, জামালপুর-২ জামায়াত তুলনামূলক এগিয়ে আছেন এবং জামালপুর-১ ও জামালপুর-৩ আসনে তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে বলে মাঠপর্যায়ের তথ্য বলছে।
জামালপুর–৩ আসনে বিদ্রোহী প্রার্থী থাকায় বিএনপির জন্য ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।
আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতি ভোটের সমীকরণ সম্পূর্ণ বদলে দিয়েছে।
ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্র ও নিরাপত্তা শঙ্কা চূড়ান্ত ফলাফলে বড় প্রভাব ফেলতে পারে।

Advertisement