মানুষের জীবনে কিছু সম্পর্ক আসে বসন্তের বাতাসের মতো। নিঃশব্দে মন ছুঁয়ে যায়, শূন্যতাকে পূর্ণ করে, অন্ধকার দিনে একটু আলোর মতো পাশে দাঁড়ায়। আবার কিছু সম্পর্ক আসে, যাদের জন্য আমরা ধীরে ধীরে নিজের ভেতরের অনেকটা জায়গা ছেড়ে দিই। তাদের হাসিতে হাসি, তাদের দুঃখে কাঁদি, তাদের প্রয়োজনকে নিজের প্রয়োজনের আগে রাখি।
একসময় বুঝতে পারি, যাকে এতটা আপন ভেবেছিলাম, তার কাছে হয়তো আমি ততটা আপন নই।
এই উপলব্ধিটা বড় কষ্টের।
কারণ মানুষ অপরিচিতের অবহেলায় যতটা কষ্ট পায়, আপন মানুষের অবহেলায় তার চেয়ে অনেক বেশি ভেঙে পড়ে। অপরিচিত মানুষ আঘাত করলে আমরা দূরে সরে যেতে পারি, কিন্তু আপন মানুষ আঘাত করলে হৃদয়ের ভেতরেই যেন একটা দীর্ঘশ্বাস জমে থাকে। মুখে কিছু বলা যায় না, আবার নীরবে সহ্য করাও যায় না।
তবুও জীবনের একসময় এসে শিখতে হয়, অতিরিক্ত আপন হতে গিয়ে নিজেকেই হারিয়ে ফেলা যাবে না।
কাউকে ভালোবাসা অপরাধ নয়। কারও প্রতি শ্রদ্ধাশীল হওয়া দুর্বলতা নয়। কারও জন্য নিজের সময়, শ্রম কিংবা সামর্থ্য বিলিয়ে দেওয়াও ছোট কোনো বিষয় নয়। বরং এগুলো মানুষের হৃদয়ের সৌন্দর্য।
কিন্তু সেই সৌন্দর্যেরও একটি সীমারেখা থাকা প্রয়োজন।
কারণ আপনি যখন কাউকে প্রয়োজনের চেয়েও বেশি গুরুত্ব দিতে থাকেন, নিজের কষ্ট লুকিয়ে তার হাসিকে বাঁচিয়ে রাখেন, বারবার তার ভুল ক্ষমা করেন, তার অবহেলার পরও ফিরে যান, তখন একসময় আপনার ভালোবাসা তার কাছে ভালোবাসা না হয়ে অভ্যাসে পরিণত হতে পারে।
আপনার ফোনের অপেক্ষা করা, আপনার খোঁজ নেওয়া, আপনার পাশে থাকা, আপনার ফিরে আসা, সবকিছুই তার কাছে এত স্বাভাবিক হয়ে যায় যে একদিন আপনার অনুপস্থিতিই আর তাকে ভাবায় না।
মানুষের মন বড় বিচিত্র।
যে মানুষটি প্রতিদিন দরজায় কড়া নাড়ে, তার শব্দ একসময় ঘরের স্বাভাবিক শব্দ হয়ে যায়। কিন্তু সেই কড়া নাড়ার শব্দ যখন একদিন থেমে যায়, তখন নীরবতাই বলে দেয়, সেখানে কেউ ছিল।
তাই জীবনে কখনো কখনো একটু দূরে দাঁড়ানো প্রয়োজন। নিজের উপস্থিতির মূল্য বোঝাতে নয়, বরং নিজের অস্তিত্বটাকে মনে করিয়ে দিতে।
সবসময় সবার জন্য ছুটে যেতে নেই। প্রত্যেক কান্নার দায় নিজের কাঁধে নিতে নেই। প্রতিটি সম্পর্ক একা হাতে বাঁচিয়ে রাখার চেষ্টা করতে নেই।
কিছু মানুষকে ভালোবেসেও দূরে থাকতে হয়।
কিছু মানুষকে ক্ষমা করেও জীবনে আর জায়গা দেওয়া যায় না।
কিছু সম্পর্ককে মনে রেখেও পথ আলাদা করে নিতে হয়।
এগুলো নিষ্ঠুরতা নয়। কখনো কখনো এগুলোই আত্মমর্যাদার শেষ আশ্রয়।
আমরা অনেক সময় ভাবি, একটু বেশি সহ্য করলে সম্পর্কটা হয়তো সুন্দর হবে। একটু বেশি নত হলে মানুষটি হয়তো বুঝবে। আরেকবার ক্ষমা করলে হয়তো সবকিছু আগের মতো হয়ে যাবে।
কিন্তু সব সম্পর্ক ফিরে পাওয়ার জন্য নয়। কিছু সম্পর্ক আমাদের শেখানোর জন্য আসে, আমরা যেন পরেরবার নিজের মূল্যটা একটু ভালোভাবে বুঝতে পারি।
মনে রাখতে হবে, আপনার নরম হৃদয় কারও জন্য আপনার বিরুদ্ধে ব্যবহারের অস্ত্র হতে পারে না।
আপনি ভালো মানুষ বলেই সবাইকে আপনার সরলতার সুযোগ নিতে দিতে হবে, এমন কোনো নিয়ম নেই।
আপনি বিশ্বস্ত বলেই কারও অন্যায়কে মেনে নিতে হবে না।
আপনি ক্ষমাশীল বলেই বারবার একই আঘাত সহ্য করতে হবে না।
আর আপনি কাউকে ভালোবাসেন বলেই নিজের আত্মসম্মান তার পায়ের কাছে রেখে দিতে হবে না।
আত্মসম্মান অহংকার নয়। আত্মসম্মান হলো নিজের হৃদয়ের প্রতি ন্যায়বিচার।
যেখানে আপনার কথা শোনা হয় না, সেখানে সবসময় কথা বলার প্রয়োজন নেই। যেখানে আপনার উপস্থিতির মূল্য নেই, সেখানে নিজেকে বারবার প্রমাণ করার প্রয়োজন নেই। যেখানে আপনার ভালোবাসা কেবল প্রয়োজনের সময় মনে পড়ে, সেখানে নিজের হৃদয়টাকে প্রতিদিন একটু একটু করে ভাঙারও প্রয়োজন নেই।
কারণ পৃথিবীতে এমন কিছু মানুষ অবশ্যই আছে, যারা আপনার নীরবতাও বুঝবে, আপনার অভিমানও পড়তে পারবে, আপনার অনুপস্থিতির কারণ জানতে চাইবে।
তাদের জন্য নিজের হৃদয় খোলা রাখুন।
কিন্তু যারা আপনার ভালোবাসাকে দুর্বলতা মনে করে, তাদের জন্য নিজের আত্মমর্যাদাকে বিসর্জন দেবেন না।
জীবনের সবচেয়ে কঠিন বিদায় কখনো কখনো কোনো মানুষকে নয়, নিজের পুরোনো অভ্যাসকে দিতে হয়। সেই অভ্যাস, যেখানে অন্যের সুখের জন্য নিজের কষ্টকে প্রতিদিন চাপা দিয়েছেন। সেই অভ্যাস, যেখানে অবহেলার পরও ফিরে গেছেন। সেই অভ্যাস, যেখানে নিজের প্রয়োজনকে সবশেষে রেখেছেন।
একদিন আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকেই বলতে হয়, “এবার একটু নিজের জন্য বাঁচি।”
তারপর ধীরে ধীরে বদলে যায় অনেক কিছু।
সব ফোনের উত্তর সঙ্গে সঙ্গে দিতে হয় না। সব সম্পর্কের ভার একা কাঁধে নিতে হয় না। সবাইকে খুশি করার দায়িত্বও নিজের নয়।
কিছু দরজা বন্ধ থাকে বলেই জীবনের কিছু জানালা খুলে যায়।
কিছু মানুষ চলে যায় বলেই আমরা নিজের সঙ্গে নতুন করে পরিচিত হই।
আর কিছু সম্পর্ক ভেঙে যায় বলেই বুঝতে পারি, সম্পর্ক ধরে রাখার চেয়ে কখনো কখনো নিজেকে ধরে রাখা বেশি জরুরি।
তাই ভালোবাসুন। গভীরভাবে ভালোবাসুন। মানুষকে সম্মান করুন। বিপদে পাশে দাঁড়ান। বিশ্বস্ত থাকুন।
তবে নিজের অস্তিত্বের বিনিময়ে নয়।
কারও জীবনে ছায়া হয়ে থাকতে গিয়ে নিজের আলো নিভিয়ে ফেলবেন না। কারও পাশে দাঁড়াতে গিয়ে নিজের মেরুদণ্ড বাঁকিয়ে ফেলবেন না। কাউকে আপন করতে গিয়ে নিজেকেই পর করে দেবেন না।
আপনি কারও অবহেলার গল্প হওয়ার জন্য জন্মাননি। আপনি সম্মান পাওয়ারও যোগ্য। ভালোবাসা পাওয়ারও যোগ্য। যত্ন পাওয়ারও যোগ্য।
তাই অতিরিক্ত আপন হতে গিয়ে নিজেকেই হারাবেন না।
কারণ মানুষ চলে গেলে শূন্যতা পূরণ করা যায়, সম্পর্ক হারালে নতুন সম্পর্ক গড়া যায়, কিন্তু নিজের ভেতরের মানুষটিকে হারিয়ে ফেললে তাকে ফিরে পাওয়া সবচেয়ে কঠিন।
অন্যকে ভালোবাসার আগে, নিজের আত্মমর্যাদাটুকুকে ভালোবাসতে শিখুন।
কারণ শেষ পর্যন্ত পৃথিবীর সবচেয়ে দীর্ঘ সম্পর্কটি অন্য কারও সঙ্গে নয়, নিজের সঙ্গেই।
সেই সম্পর্কটুকু যেন অন্তত অবহেলায় না হারায়।
– আব্দুর রহিম খান, লেখক ও সাংবাদিক
