সভ্যতার ইতিহাসে আলো আর অন্ধকারের লড়াই কখনো থেমে থাকেনি। সত্য যখন মাথা তুলে দাঁড়িয়েছে, মিথ্যাও তখন তার সমস্ত শক্তি নিয়ে আঘাত হেনেছে। মানুষ যখন কল্যাণের পথে এক কদম এগিয়েছে, অকল্যাণ তখন দশ কদম এগিয়ে তাকে পথচ্যুত করার চেষ্টা করেছে। এ এক চিরন্তন দ্বন্দ্ব। এই দ্বন্দ্ব কেবল রাজনীতি, অর্থনীতি কিংবা সংস্কৃতির নয়, এটি মানুষের আত্মা, বিবেক ও বিশ্বাসকে ঘিরেও।
আজকের পৃথিবী সেই দ্বন্দ্বের সবচেয়ে জটিল অধ্যায় অতিক্রম করছে। চারদিকে চোখ মেললেই দেখা যায়, বাহ্যিক উন্নয়নের ঝলকানির আড়ালে মানুষ ধীরে ধীরে হারিয়ে ফেলছে তার অন্তরের আলো। বহুতল অট্টালিকা উঠছে, কিন্তু ভেঙে পড়ছে চরিত্রের ভিত। প্রযুক্তি মানুষকে কাছাকাছি এনেছে, অথচ হৃদয়গুলোকে করেছে বিচ্ছিন্ন। ভোগের উৎসব যত বিস্তৃত হয়েছে, তত সংকুচিত হয়েছে আত্মার প্রশান্তি।
এই সময়েই শয়তানের সেই চিরন্তন ঘোষণা যেন নতুন করে বাস্তব হয়ে ওঠে। মহান আল্লাহ কুরআনে শয়তানের ভাষায় বলেছেন, “আমি তাদের সামনে থেকে, পেছন থেকে, ডান দিক থেকে এবং বাম দিক থেকে তাদের কাছে আসব।” (সূরা আল-আরাফ: ১৭)
শয়তান আজ আর শুধু গুনাহের আহ্বান জানায় না। সে কখনো বিভ্রান্তিকে জ্ঞানের নামে, কখনো ভোগবাদকে স্বাধীনতার নামে, কখনো নৈতিক অবক্ষয়কে আধুনিকতার নামে, আবার কখনো ঈমানহীনতাকে প্রগতির নামে মানুষের সামনে সাজিয়ে দেয়। ফলে মানুষ বুঝতেই পারে না, কখন সে আলোর পথ ছেড়ে অন্ধকারের দিকে হাঁটতে শুরু করেছে।
এই ভয়াবহ সময়ে কিছু মানুষ মনে করেন, সমাজের অন্ধকার থেকে নিজেকে সরিয়ে নেওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ। তারা মনে করেন, নিজের ইবাদত, নিজের তাকওয়া আর নিজের মুক্তিই যথেষ্ট। কিন্তু ইসলাম কি আমাদের এই শিক্ষা দেয়?
না, ইসলাম কেবল নিভৃত কক্ষের ইবাদতের নাম নয়। ইসলাম মানুষের ভিড়ে থেকেও মানুষকে আলোর পথ দেখানোর শিক্ষা দেয়। নবী-রাসুলদের জীবন তারই উজ্জ্বল প্রমাণ। তাঁরা পাহাড়ের গুহায় লুকিয়ে থাকেননি, বরং অন্ধকারাচ্ছন্ন সমাজের বুকেই সত্যের প্রদীপ জ্বালিয়েছেন।
একটি জনপদে যদি মহামারী ছড়িয়ে পড়ে, আর চিকিৎসকরা নিজেদের নিরাপত্তার কথা ভেবে শহর ছেড়ে পালিয়ে যান, তবে তাদের বিদ্যা কি মানুষের কোনো উপকারে আসে? তেমনি সমাজ যখন নৈতিক মহামারীতে আক্রান্ত, তখন ঈমানদার মানুষের দায়িত্ব সমাজ ছেড়ে পালানো নয়, বরং মানুষের হাত ধরে আলোর পথে ফিরিয়ে আনা।
যে প্রদীপ কেবল মাজারের অলংকার হয়ে জ্বলে, অথচ পথহারা মানুষের পথে আলো ফেলতে পারে না, তার জ্বলে থাকা আর নিভে থাকা প্রায় সমান। ঠিক তেমনি যে ঈমান মানুষের জীবন বদলায় না, অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর সাহস জোগায় না, অসহায়ের পাশে দাঁড়াতে শেখায় না, সমাজে ন্যায়ের সুবাস ছড়ায় না, সে ঈমান নিজের পূর্ণ সৌন্দর্য প্রকাশ করতে পারে না।
ঈমান কোনো সিন্দুকে তুলে রাখা অলংকার নয়। এটি এমন এক অমূল্য পুঁজি, যা মানুষের কল্যাণে ব্যয় করলে আরও সমৃদ্ধ হয়। চরিত্র, সততা, ত্যাগ, সাহস ও সত্যবাদিতা, এগুলো যত মানুষের মাঝে ছড়িয়ে পড়ে, ততই সমাজ আলোকিত হয়। আর যদি ক্ষয় হওয়ার ভয়ে এগুলোকে লুকিয়ে রাখা হয়, তবে সেগুলো একদিন ব্যবহারহীন সম্পদের মতোই মূল্য হারায়।
যারা সত্যের পথে হাঁটেন, তাদের জন্য ঝড় নতুন নয়। অপবাদ, কষ্ট, ত্যাগ, বঞ্চনা, এমনকি জীবন বিসর্জনও এই পথের ইতিহাসে বারবার লেখা হয়েছে। তবুও ইতিহাস তাদেরই স্মরণ করে, যারা ভয়কে জয় করে মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছেন। কারণ, পরিবর্তন কখনো দর্শকের হাতে জন্ম নেয় না; পরিবর্তন সৃষ্টি করেন তারাই, যারা মাঠে নামেন।
আজ আমাদের সবচেয়ে বড় সংকট অর্থের নয়, অস্ত্রের নয়, প্রযুক্তিরও নয়। আমাদের সবচেয়ে বড় সংকট চরিত্রের, বিবেকের এবং দায়িত্ববোধের। এই সংকট দূর করতে প্রয়োজন এমন মানুষ, যাদের ঈমান কেবল সিজদায় নয়, সততায় প্রকাশ পায়; কেবল তাসবিহে নয়, ন্যায়বিচারে প্রতিফলিত হয়; কেবল মসজিদে নয়, সমাজের প্রতিটি অঙ্গনে আলো ছড়িয়ে দেয়।
হয়তো পৃথিবী আমাদের নাম মনে রাখবে না। কিন্তু যদি একজন মানুষও আমাদের আচরণ দেখে সত্যের পথে ফিরে আসে, যদি একটি পরিবারও আমাদের সততায় অনুপ্রাণিত হয়, যদি একটি শিশু আমাদের চরিত্র দেখে সুন্দর মানুষ হওয়ার স্বপ্ন দেখে, তবে সেটিই হবে আমাদের জীবনের সবচেয়ে বড় অর্জন।
কারণ, আল্লাহর জমিনে সবচেয়ে সুন্দর মানুষ সে-ই, যে নিজে আলোর পথে চলে এবং অন্যের হাতেও একটি প্রদীপ তুলে দেয়। সেই প্রদীপের নাম ঈমান। সেই আলোর নাম আমল। আর সেই পথের নাম, সমাজ পরিবর্তনের সংগ্রাম।
– আব্দুর রহিম খান, লেখক ও সাংবাদিক
