প্রতিটি জাতীয় সংকটের পর আমাদের সমাজে একটি পুরোনো প্রবণতা নতুন করে ফিরে আসে। প্রকৃত সমস্যা, নীতিগত ব্যর্থতা এবং রাষ্ট্রের দায়িত্ব নিয়ে প্রশ্ন তোলার পরিবর্তে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু বানানো হয় তরুণদের। যেন রাষ্ট্রের সীমাবদ্ধতার দায়ও শেষ পর্যন্ত তাদের কাঁধেই বর্তায়।
কেউ খেলাধুলা দেখেছে, কেউ বন্ধুদের সঙ্গে সময় কাটিয়েছে, কেউ সামাজিক মাধ্যমে সক্রিয় ছিল, আবার অসংখ্য তরুণ স্বেচ্ছায় ত্রাণ সংগ্রহ করেছে, রক্ত দিয়েছে, দুর্গত মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছে। এই বৈচিত্র্যই একটি সমাজের স্বাভাবিক চিত্র। কিন্তু কিছু বিচ্ছিন্ন ঘটনা বা দৃশ্যকে ভিত্তি করে পুরো শিক্ষার্থী সমাজ বা তরুণ প্রজন্মকে দায়ী করা শুধু অন্যায় নয়, এটি একটি বিপজ্জনক সাধারণীকরণও।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, দুর্যোগ মোকাবিলা, নাগরিকের জীবন ও সম্পদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং প্রয়োজনীয় সহায়তা পৌঁছে দেওয়া রাষ্ট্রের সাংবিধানিক ও নৈতিক দায়িত্ব। নাগরিকের স্বেচ্ছাসেবী উদ্যোগ প্রশংসনীয়, কিন্তু সেটিকে রাষ্ট্রের দায়িত্বের বিকল্প হিসেবে দাঁড় করানো যায় না। যখন নাগরিকের মানবিকতাকে রাষ্ট্রের ব্যর্থতা ঢাকার উপায় বানানো হয়, তখন প্রকৃত জবাবদিহির প্রশ্ন দুর্বল হয়ে পড়ে।
আরও উদ্বেগের বিষয়, সমাজের একটি অংশ প্রায়ই তরুণদের সম্পর্কে এমন ভাষায় কথা বলে, যেন তারা নৈতিক অবক্ষয়ের প্রতীক। কখনও তাদের ধর্মীয় পরিচয় নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়, কখনও তাদের চরিত্র নিয়ে, আবার কখনও তাদের চিন্তাশক্তিকেই অবমূল্যায়ন করা হয়। অথচ বাস্তবতা হলো, ভালো-মন্দ, ধার্মিক-অধার্মিক, সচেতন-অসচেতন সব ধরনের মানুষ সমাজের প্রতিটি স্তরেই রয়েছে। কোনো একটি গোষ্ঠীকে আলাদা করে দোষারোপ করা সত্যকে বিকৃত করার শামিল।
সমাজ পরিবর্তনের ইতিহাস ভিন্ন কথা বলে। যুগে যুগে জ্ঞানচর্চা, সামাজিক সংস্কার, অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ এবং নতুন রাষ্ট্রচিন্তার সূচনা হয়েছে তরুণদের হাত ধরেই। তাদের প্রশ্ন করার সাহস আছে, নতুনভাবে ভাবার ক্ষমতা আছে এবং প্রচলিত ভুলকে চ্যালেঞ্জ করার মানসিকতাও আছে। এই শক্তিকে ভয় নয়, সঠিক দিকনির্দেশনা দেওয়াই একটি সুস্থ সমাজের কাজ।
ধর্মীয় বা সামাজিক বক্তৃতারও একটি বড় দায়িত্ব রয়েছে। মানুষের নৈতিক উন্নতি, সত্য প্রতিষ্ঠা এবং ন্যায়বিচারের পক্ষে কথা বলাই সেই দায়িত্বের মূল অংশ। কিন্তু যদি সেই বক্তব্য সমাজে বিভাজন সৃষ্টি করে, একটি পুরো প্রজন্মকে সন্দেহের চোখে দেখতে শেখায় কিংবা প্রকৃত সমস্যার পরিবর্তে গৌণ বিষয়কে সামনে নিয়ে আসে, তবে তা সমাজের উপকারের চেয়ে ক্ষতিই বেশি করে।
আজ আমাদের প্রয়োজন দোষারোপের সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসা। প্রয়োজন এমন একটি সমাজ, যেখানে তরুণদের সম্ভাবনাকে সম্মান করা হবে, তাদের ভুলকে সংশোধনের সুযোগ দেওয়া হবে এবং একই সঙ্গে রাষ্ট্র ও প্রতিষ্ঠানের কাছে তাদের নিজ নিজ দায়িত্ব পালনের কঠোর জবাবদিহি নিশ্চিত করা হবে।
কারণ ইতিহাসের প্রতিটি আলোকিত অধ্যায় আমাদের একটি কথাই মনে করিয়ে দেয়, কোনো জাতির ভবিষ্যৎ গড়ে ওঠে তার তরুণদের হাত ধরেই। তাই তরুণদের অবমূল্যায়ন নয়, তাদের প্রতি আস্থা, ন্যায়ভিত্তিক মূল্যায়ন এবং রাষ্ট্রের প্রতি জবাবদিহির দাবিই হওয়া উচিত আমাদের সময়ের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উচ্চারণ।
– আব্দুর রহিম খান, সাংবাদিক ও সাহিত্যিক
