Skip to content
প্রকাশ- November 2, 2026 , 16:54 pm
মুক্তমত

বই আলোচনা: ‘জীবন-কথা মির্জা আশরাফ উদ্দিন হায়দার’

বই আলোচনা: ‘জীবন-কথা মির্জা আশরাফ উদ্দিন হায়দার’

শাহ্ মোহাম্মদ কবীর, অ্যাডভোকেট, জেলা ও দায়রা জজ কোর্ট, জামালপুর: 

জামালপুর-শেরপুর অঞ্চলের ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনের পুরোধা ব্যক্তিত্ব ছিলেন মির্জা আশরাফ উদ্দিন হায়দার(১৯০৫-১৯৮৫)। জামালপুর জেলার উন্নয়ন ও অগ্রগতির সঙ্গে তার নামটি ওতপ্রোতভাবে জড়িত।তিনি জামালপুর-শেরপুরবাসীর নিকট মির্জা সাহেব নামে সমধিক পরিচিত ছিলেন।তার দীর্ঘ ত্রিকালদর্শী জীবন ও কর্ম নিয়ে ছত্রিশ বছর পর বিশিষ্ট গবেষক, প্রাবন্ধিক শাহ্ মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান “জীবন-কথা মির্জা আশরাফ উদ্দিন হায়দার” নামে একটি তথ্যবহুল ও প্রামাণিক গ্রন্থ রচনা করেছেন। লেখক শাহ্ মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান (জন্ম ১০ই জুন, ১৯৮৫) পেশাগত জীবনে বাংলা একাডেমির কর্মকর্তা হলেও ছাত্র জীবন হতেই দেশ-বিদেশের বিভিন্ন পত্রপত্রিকা ও জার্নালে নিয়মিত লিখছেন। কাজী নজরুল ইসলামের ওপর ও আইন বিষয়ে তাঁর প্রকাশিত প্রবন্ধগুলো পাঠক সমাদৃত হয়েছে। ‘অমর একুশে বাংলা একাডেমির ৬০ বছর ও আন্তর্জাতিক সাহিত্য সম্মেলন ২০১৫ স্মারকপত্রে’র প্রকাশনা সহকারী এবং পাঁচ খণ্ডে সমাপ্য ‘জেলা সাহিত্যমেলা ২০২২’ গ্রন্থের প্রকাশনা পরিষদের সদস্য ছিলেন তিনি। ‘কাজী নজরুলের কারাজীবন’ (২০২৩), ‘ডা.মো.জাকির হোসেন:কালসমুদ্রে আলোরযাত্রী’ (২০২৪), ‘স্মৃতি কথা:বর্ধমান হাউসে কাজী নজরুল’ (২০২৫) লেখকের প্রকাশিত উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ।

Advertisement

অত্যন্ত দুঃখজনক হলেও সত্য এই যে, এ অঞ্চলের বর্তমান প্রজন্মের কাছে মির্জা আশরাফ উদ্দিন হায়দার তথা মির্জা সাহেব এখন প্রায় বিস্মৃত। অথচ এমনটি হওয়ার কথা ছিল না’। বিশ শতকের আশির দশক পর্যন্ত তিনি এই অঞ্চলের নানাবিধ সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের বীজ বপন করেন। যার ঐতিহাসিক গুরুত্ব অপরিসীম।জামালপুর-শেরপুর অঞ্চলের পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীকে আলোকিত করার ক্ষেত্রে মির্জা সাহেবের অবদান কখনোই ভুলার নয়। এই হিসেবে তিনি জামালপুর জেলার ইতিহাসের আলোকিত অংশ। মির্জা সাহেব ছিলেন ব্রিটিশ আমলে বিশ শতকের চল্লিশের দশকে তদানীন্তন শেরপুর থানার ও বাংলাদেশের সত্তরের দশকে জামালপুরের দীর্ঘদিন প্রথম শ্রেণির ক্ষমতাপ্রাপ্ত অনারারি ম্যাজিস্ট্রেট।

অনারারি ম্যাজিস্ট্রেটগণ সমাজে অত্যন্ত সম্মানীয়।তাঁরা ছোটখাট ও লঘু অপরাধের ফৌজদারি বিচারকার্য সম্পন্ন করেন।তাঁরা সংক্ষুব্ধ কোনো ব্যক্তির লিখিত অভিযোগ বা পুলিশের প্রদত্ত প্রতিবেদনের ভিত্তিতে বা অপরাধ সংঘটনে নিজেদের প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে কোনো অপরাধ আমলে নিতে পারেন।অনারারি ম্যাজিস্ট্রেট কি কি দায়িত্ব প্রতিপালন করেন এবং তাঁর অধিকার ও ক্ষমতা কি, সেসব বিষয়ে ফৌজদারি কার্যবিধিতে সুনির্দিষ্টভাবে কোনো বিধান নেই। বিশেষ আইন দ্বারা তাঁদের দায়িত্ব ও অধিকার নির্ণীত হয়ে থাকে।অনারারি ম্যাজিস্ট্রেটরা এ দেশের স্বাধীনতা সংগ্রাম থেকে শুরু করে সর্বক্ষেত্রে অবদান রেখেছেন। তাঁদের এই অবদানের উপর গবেষণা হওয়া প্রয়োজন। সমকালে অনারারি ম্যাজিস্ট্রেটদের বিচার প্রক্রিয়াকে কোনোভাবেই অস্বীকার করা যায় না।

এদেশের ইতিহাস ও ঐতিহ্যে এরকম একজন অনারারি ম্যাজিস্ট্রেট ছিলেন মির্জা আশরাফ উদ্দিন হায়দার।তিনি ছিলেন একাধারে বৃটিশ বিরোধী আন্দোলনের একজন সক্রিয় কর্মী, সমাজসেবী ও সাহিত্যিক।এদেশের ব্রিটিশ বিরোধী স্বাধীনতা সংগ্রাম থেকে স্বাধীন বাংলাদেশ অর্জন নেপথ্যে তাঁর অবদান অনস্বীকার্য।

‘জীবন-কথা মির্জা আশরাফ উদ্দিন হায়দার’ গ্রন্থখানি বিজয় প্রকাশ, ঢাকা থেকে প্রকাশিত হয়েছে। গ্রন্থটির প্রচ্ছদ এঁকেছেন আনিছুর রহমান লয়েট, পৃষ্ঠা:১৪৪, মূল্য:৩০০ টাকা। গ্রন্থটির সূচিতে ছোট বড় ২৭ টি অনুচ্ছেদে বিভক্ত। বিভক্ত অংশগুলো হলো জীবন-কথা, সমকালীন পরিবেশ-পটভূমি, জন্ম ও বংশপরিচয়, জীবন-দর্শন, পরিবার-পরিচিতি, শৈশবকাল, বাল্যজীবন, শিক্ষাজীবন, রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড, দেশবন্ধুর সাহচর্য, রাজনীতিতে অংশগ্রহণের মূল্যায়ন, কর্মজীবন, সাময়িকপত্র সম্পাদনা, সামাজিক সংগঠনে সংশ্লিষ্টতা, সমাজসেবা, অনারারি ম্যাজিস্ট্রেট ও বেঞ্চকোর্টেও সদস্যরূপে, সাহিত্যচর্চা ও সাংবাদিকতা, সমকালে কতিপয় ব্যক্তিত্বের সান্নিধ্য, কতিপয় চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য, সমকালীন প্রতিক্রিয়া, স্মৃতিরক্ষা ও স্বীকৃতি, জীবনপঞ্জি, রচনা-নিদর্শন, চিঠিপত্র, শেষজীবন ও মৃত্যু, মৃত্যুর পর তাঁর সম্পর্কে পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত লেখালেখিতে তথ্য ও আলোকচিত্র।

লেখক এ বইয়ের মাধ্যমে মির্জা আশরাফ উদ্দিন হায়দারের জীবন ও কর্মের সংক্ষিপ্ত আলোচনার চেষ্টা করেছেন। এ বই হতে জানা যায়, মির্জা আশরাফ উদ্দিন হায়দার ১৯০৫ সালে বর্তমান বকশীগঞ্জ উপজেলার নিলক্ষিয়ার তৎকালীন পাতিলাদহ পরগণার সম্ভ্রান্ত মুসলিম জোতদার পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতার নাম মির্জা আসাদ উদ্দিন হায়দার ও মাতার নাম তৈনুব নেসা। এ সম্বন্ধে তৎকালীন পত্রপত্রিকা ও গোলাম মোহাম্মদ- এর ‘জামালপুরের গণইতিবৃত্ত’ (১৯৫৪) গ্রন্থে লেখা রয়েছে।

শিশুকালে মির্জা আশরাফ উদ্দিন হায়দারের মা ইন্তেকাল করেন। তিনি তাঁর নানীর আদর স্নেহে লালিত পালিত হন। আশরাফ উদ্দিন হায়দার পারিবারিক প্রতিষ্ঠানে প্রাথমিক শিক্ষালাভের পর ১৯১৩ সালে ময়মনসিংহ জিলা স্কুলে ভর্তি হন ।এ প্রতিষ্ঠানে তিনি কয়েক বছর পড়াশোনা করেন। এ সময় মহাত্মা গান্ধীর (১৮৬৯-১৯৪৭) ডাকে অবিভক্ত বাংলাসহ সারা ভারতবর্ষে অসহযোগ আন্দোলন তীব্র আকার ধারণ করে। এ আন্দোলনের তীব্রতা এতই বেশি ছিল যে বঙ্গভঙ্গের (১৯০৫) সময়েও ভারতবর্ষের এরকম মূর্তিধারণ করেনি।

দেশের অন্যান্য স্থানের মতো বৃহত্তর জামালপুরেও গান্ধীজির চিন্তা চেতনা ছড়িয়ে পড়ে। মির্জা আশরাফ উদ্দিন হায়দার ম্যাট্রিকুলেশন পরীক্ষা না দিয়েই গান্ধীজির অসহযোগ আন্দোলনে নেমে পড়েন।পরবর্তীকালে দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশের (১৮৭০-১৯২৫) সঙ্গে ভারতবর্ষের বিভিন্ন জায়গায় ঘুরে বেড়ান এবং বাঙালি জাতীয়তাবাদীর একজন খাঁটি সংগ্রামী কর্মী হিসেবে নিজেকে তৈরি করেন। এ সময় তিনি ভারতবর্ষের বিভিন্ন স্থানে মিটিং মিছিলের নেতৃত্ব দেন। এ কারণে তিনি কিছুটা দেরিতে ১৯৩৯ সালে বর্তমান শেরপুর জেলার গোবিন্দকুমার (জি.কে.) পাইলট উচ্চ বিদ্যালয় থেকে মেট্রিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন।
(তথ্যসূত্র: বাংলাদেশের লোকজ সংস্কৃতি গ্রন্থমালা: জামালপুর, শামসুজ্জামান খান (প্রধান সম্পাদক, প্রথম প্রকাশ: ২০১৩, বাংলা একাডেমি, পৃ.৭৫).
অতঃপর তিনি ১৯৪১ সালে বর্তমানে সরকারি আনন্দমোহন কলেজ থেকে আই. এ. পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। পরে এ কলেজে বি.এ. ক্লাসে ভর্তি হন কিন্তু পড়ালেখা সম্পন্ন না করেই দেশের ডাকে এ অঞ্চলের জাতীয়তাবাদী প্রগতিশীল রাজনীতিসহ নানা জনহিতকর কল্যাণমূলক কাজে নিজেকে যুক্ত করেন।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত বৃহত্তর জামালপুরের বকশিগঞ্জ, দেওয়ানগঞ্জ, শেরপুর (তখন থানা) অঞ্চলে অনেক সেবামূলক কাজ করেন।জনহিতকর কাজের জন্য ব্রিটিশ রাজ সরকার তাকে শ্রদ্ধা ও সম্মানের চোখে দেখত। এ সময় ব্রিটিশ সরকার তাকে এ অঞ্চলের জন্য অনারারি ম্যাজিস্ট্রেট বা জাস্টিস অফ দি পিস নিযুক্ত করেন। চল্লিশ দশকের পুরো সময় তাঁর বেঞ্চকোর্টে তিনি স্থানীয় ছোটখাট অনেক ফৌজদারি মামলার সুষ্ঠু বিচার করে নিষ্পত্তি করেন।

তিনি সমকালে গঠিত ইউনিয়ন বোর্ড (বর্তমানে ইউনিয়ন পরিষদ), স্পেশাল ঋণ সালিশি বোর্ডসহ বিভিন্ন সংগঠনের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেছেন। সমকালীন জাতীয় রাজনীতিক নেতৃবৃন্দের সঙ্গে তাঁর পরিচয় ছিল। শেরে বাংলা এ.কে. ফজলুল হক (১৮৭৩-১৯৬২), হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীসহ সমকালের অনেক নেতৃবর্গের সঙ্গে তাঁর ব্যক্তিগত যোগাযোগ ও পরিচয় ছিল।
মির্জা আশরাফ উদ্দিন হায়দার বাংলাদেশ আমলেও সত্তর দশকে দ্বিতীয়বার জামালপুরের প্রথম শ্রেণির অনারারি ম্যাজিস্ট্রেট নিযুক্ত হয়েছিলেন। এই দায়িত্ব তিনি দক্ষতার সাথে পালন করেন।বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানসহ সমকালীন অনেক রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের সাথে তাঁর পরিচয় ও যোগাযোগ ছিল। বঙ্গবন্ধু এ অঞ্চলে এলে তাঁর খবর নিতেন। মির্জা
আশরাফ উদ্দিন হায়দার এ অঞ্চলে শিক্ষার আলো ছড়িয়ে দিতে বেশ কটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা ও পরিচালনার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।বকশিগঞ্জের ঐতিহ্যবাহী নিলক্ষিয়া রূপজাহান পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়, সরকারি আশেক মাহমুদ কলেজ, জামালপুর উচ্চ বিদ্যালয় এ সবের মধ্যে উল্লেখযোগ্য।এছাড়াও তিনি নিলক্ষিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, জামালপুরের দেউরপাড়া চন্দ্রা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠায় প্রধান উদ্যোগী ভূমিকা পালন করেন।

একজন ক্রীড়া ও সাংস্কৃতিক কর্মী হিসেবেও তিনি এ অঞ্চলে সুপরিচিত ছিলেন।তিনি বেশ কটি ক্রীড়া ও সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান পরিচালনা ও প্রতিষ্ঠার সাথে যুক্ত ছিলেন। তিনি এ অঞ্চলের শান্তি-শৃংঙ্খলা ও নিরাপত্তা রক্ষার জন্য গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনী গঠন করেন।

প্রখ্যাত আলেম পুরুষ হযরত শাহ জামাল (র.)-এর পূণ্যভূমি জামালপুরের মাটি – অথচ তাঁর নামে কোনো মৌজা, গ্রাম হাটবাজার বা কোনো স্থাপনার নাম ছিল না। মির্জা আশরাফ উদ্দিন হায়দার জামালপুর শহরের রেল স্টেশনের নাম সিংহজানী জংশন থেকে জামালপুর টাউন জংশন নাম পরিবর্তনের জন্য কার্যকর ভূমিকা পালন করেন। ফলশ্রুতিতে ১৯৫৪ সালে ১৪ই আগস্ট এক সরকারি গেজেট বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী ‘জামালপুর টাউন জংশন’ নামকরণ করা হয়।
এ অঞ্চলে সংবাদপত্র প্রকাশ ও সাংবাদিকতায় তাঁর ভূমিকা অনন্য। তিনি এ অঞ্চলের সাংবাদিকতার উন্মেষকালে সাংবাদিকতা করেছেন এবং তওফিক নামে ১৯৫০ সালে সাপ্তাহিক সংবাদপত্রের প্রকাশক-সম্পাদক-মুদ্রকের ভূমিকা পালন করেছেন।
তাঁর প্রতিষ্ঠিত মুদ্রণালয়ের নাম ছিল আমেনা প্রেস। এ প্রেস থেকে গোলাম মোহাম্মদের প্রণীত ‘জামালপুরের গণইতিবৃত্ত’সহ কয়েকটি গ্রন্থ প্রকাশিত ও মুদ্রিত হয়েছিল। মির্জা আশরাফ উদ্দিন হায়দার সাহিত্যিক হিসেবেও সমকালে সুধীমহলে পরিচিত ছিলেন। তাঁর রচিত দুটি গ্রন্থ : ভ্রমণকাহিনি ‘আসামের জঙ্গলে’ ও উপন্যাস ‘মায়ার ভিটা’ বিখ্যাত। তিনি ১৯৫৩ সালে জামালপুরে আয়োজিত একটি সাহিত্য-সম্মেলনের অন্যতম সংগঠকের ভূমিকা পালন করেন। ১৯৬৭ সালে তিনি ‘ঝিনাই’ নামে আরও একটি পত্রিকা সম্পাদনা করেন।
এ অঞ্চলের কৃষকদের সমবায় কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত করতে তিনি অগ্রনী ভূমিকা পালন করেন। তিনি ১৯৯৫ সালে জামালপুর সেন্ট্রাল-কো-অপারেটিভ ব্যাংক প্রতিষ্ঠায় অবদান রাখেন। মির্জা সাহেব বৃহত্তর জামালপুর অঞ্চলে সমবায় সমিতি গঠনের মাধ্যমে বিদ্যুৎ সরবরাহের কাজে বিশেষ অবদান রেখেছেন। তিনি ১৯৫৯ সালে দি জামালপুর কো-অপারেটিভ ইলেকট্রনিক সাপ্লাই সোসাইটি লিঃ প্রতিষ্ঠায় কার্যকর ভূমিকা পালন করেন। তিনি জামালপুর শহরে পানি সরবরাহের জন্য ওয়াটার ওয়ার্কস নিমার্ণ কাজে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। মির্জা সাহেব ১৯৬৫ সালে জামালপুর সাব ডিভিশন কো-অপারেটিভ মাল্টি পারপাস সোসাইটি লিমিটেড ও ১৯৬৬ সালে পূর্ব পাকিস্তান কো-অপারেটিভ ইউনিয়ন লিমিটেড – এর উচ্চ পদস্থ কর্মকর্তার দায়িত্বে নিয়োজিত ছিলেন।

মির্জা সাহেব ১৯৬২ সালে জামালপুরে অন্ধ-কল্যাণ সমিতি প্রতিষ্ঠা করে বিনা পয়সায় চক্ষু চিকিৎসা সেবার ব্যবস্থা করেন। তিনি এখানে কলকাতা মেডিকেল কলেজের প্রখ্যাত চক্ষু বিশেষজ্ঞ ডা.টি আহমেদের নেতৃত্বে চক্ষু অপারেশনের জন্য মেডিকেল ক্যাম্প প্রতিষ্ঠা করেছিলেন।
মির্জা আশরাফ উদ্দিন হায়দার (১৯৬০-১৯৬৫) সাল পর্যন্ত জামালপুর পৌরসভার নির্বাচিত ভাইস-চেয়ারম্যান (বর্তমানে মেয়র) ছিলেন। এ সময় পাবলিক হল, পাবলিক লাইব্রেরি, স্টেডিয়াম প্রতিষ্ঠায় অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন। তিনি জামালপুরের চন্দ্রায় ১৯৫৭ সালে সুপ্রাচীন বিরাটকার হরিশ্চন্দ্রের দিঘি ক্রয় করে তা খনন ও সংস্কারের মাধ্যমে মৎস্য চাষ জনপ্রিয় করেন। এছাড়া বকশিগঞ্জের ঐতিহ্যবাহী কুরখা ও ভরসা বিল দুটি সংস্কার করে কৃষি শস্য চাষের উন্নতিতে অবদান রাখেন।

মোট কথা, মির্জা সাহেব সারাজীবন ধরে জনদরদি ভূমিকায় অবস্থান করেছিলেন। অনারারি ম্যাজিস্ট্রেট মির্জা সাহেবের কীর্তিকথা এ অঞ্চলের প্রবীণদের মুখে এখনও শোনা যায় এবং স্থানীয় ইতিহাসের বিভিন্ন পুস্তকে লিপিবদ্ধ রয়েছে। বাংলা একাডেমির লোকজ সংস্কৃতি গ্রন্থমালা : জামালপুর গ্রন্থে মির্জা আশরাফ উদ্দিন হায়দারের নামে একটি ভুক্তি আছে এবং সেখানে তাঁর সামান্য ইতিহাস উল্লেখ করা হয়েছে।

মির্জা আশরাফ উদ্দিন হায়দার ১৯৮৫ সালের ১০ই জুন ঢাকায় ইন্তেকাল করেন।মৃত্যুকালে তিনি এক কন্যা আঞ্জুমান আরা জামান যিনি ১৯৬৪ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এম.এ. ডিগ্রিধারী ছিলেন এবং দুই পুত্রের অগ্রজ ডাক্তার মির্জা আলী হায়দার বাংলাদেশের প্রখ্যাত দন্ত চিকিৎসক ছিলেন এবং কনিষ্ঠ পুত্র মির্জা হোসেইন হায়দার বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের স্বনামধন্য বিচারপতি ছিলেন।

মির্জা আশরাফ উদ্দিন হায়দারের উপর প্রণীত গ্রন্থটির রচনার তথ্য, উপাত্ত ও গবেষণা বিষয়ে দীর্ঘদিন ধরে কাজ করেছেন মর্মে লেখকের কথা অংশে গ্রন্থকার জানিয়েছেন। এ গ্রন্থ পাঠ করে একজন মির্জা আশরাফ উদ্দিন হায়দারকে অনুধাবন করা যায়। বইয়ে তাঁর জন্ম হতে মৃত্যু পর্যন্ত প্রায় সব উল্লেখযোগ্য ঘটনাই লেখক নিখুঁতভাবে তুলে এনেছেন। গ্রন্থটির বিভিন্ন অংশে সমকালীন বিশিষ্ট ব্যক্তিদের মূল্যায়ন তুলে ধরা হয়েছে। এটি এ গ্রন্থের একটি বিশিষ্ট দিক। এ বইয়ের মাধ্যমে মির্জা সাহেব সম্পর্কে আগ্রহী যে কেউই তাঁর হস্তাক্ষরের লেখা ছড়া পড়ে প্রীত হবেন। তাঁর অনেকগুলো দুর্লভ ছবি, চিঠিপত্র, মূল্যবান স্মারক বইটির তাৎপর্য বাড়িয়ে দিয়েছে। জীবনী রচনা লিখতে গেলে কালের ধুলোতে কিছু কথা বাদ পড়ে যায় কিংবা বর্ণনার ছেদ পড়ে। এ বইটির ক্ষেত্রেও এ কথা সমানভাবে প্রযোজ্য।গ্রন্থটির রচনার নিদর্শন অংশে মির্জা আশরাফ উদ্দিন হায়দারের সাহিত্যকর্ম আরও বেশি চয়ন করা গেলে ভালো হতো। আমাদের দেশের লেখক ও সাহিত্যিকগণ সাধারণত দেশ-বিদেশের বিখ্যাত লেখক, সাহিত্যিক বা রাজনীতিকদেরকে লিখেই সমাজে আলোকিত ও পরিচিত হতে চান কিন্তু এ বইয়ের লেখক শাহ্ মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান পিছিয়ে পড়া সমাজের একজন প্রত্যন্ত অঞ্চলের অসাধারণ আলোকিত ব্যক্তিত্ব মির্জা আশরাফ উদ্দিন হায়দারকে ফুটিয়ে তোলার মধ্য দিয়ে সমাজে লেখা-লেখির জগতে অনন্য নজির স্থাপন করেছেন।

সার্বিক বিবেচনায়, ‘জীবন-কথা’ মির্জা আশরাফ উদ্দিন হায়দার গ্রন্থটির বর্ণনার বিন্যাসের পূর্বাপর, সরল উপস্থাপনা ও ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ চমৎকার। এ বই নিঃসন্দেহে ঐতিহাসিক স্মারকের দাবি রাখে।জামালপুরের বিস্তৃত ব্যক্তি মির্জা আশরাফ উদ্দিন হায়দারের ওপর এই প্রকাশনা নিঃসন্দেহে নতুন প্রজন্মকে আলোক-উদ্ভাসিত করবে। তাঁর জীবন ও কর্ম উত্তর প্রজন্মের কাছে অনুসরণীয় হতে পারে আরও বহুকাল।

লেখক : শাহ্ মোহাম্মদ কবীর
অ্যাডভোকেট, জেলা ও দায়রা জজ কোর্ট, জামালপুর

 

(এই লেখায় প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব,  মুক্তকালের সম্পাদকীয় নীতিমালার প্রতিফলন নাও হতে পারে।)

Advertisement

Leave a Comment

Your email address will not be published.