খালিদ ইবনে আমিন ||
প্রতিটি সমাজেরই কোনো না কোনো অংশে ক্ষয় দেখা দেয়। এটিই বৈশ্বিক বাস্তবতা, তবুও নিয়ন্ত্রণ রাখতে হবে আগামী প্রজন্মকে সঠিক পথে পরিচালিত করতে, দেশকে এগিয়ে নিতে সমৃদ্ধির পথে। দেশের ঐতিহ্যবাহী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গুলোর প্রতি দেশবাসীর যে অগাধ আস্থা-বিশ্বাস ছিল তা আজ ম্রিয়মান, অস্তাচলগামী।
ভর্তি বাণিজ্য, কোচিং বাণিজ্য, শিক্ষক-স্টাফ নিয়োগ, কমিটি গঠন, পদায়ন সর্বত্রই এক অরাজকতা চলমান। দেখার যেন কেউ নেই, জবাবদিহিতার কোনো অবকাশ নেই। অনিয়মই যেন নিয়ম, এ অবস্থা একটি জাতির সামগ্রিক কল্যাণ, অগ্রগামিতা ও সমৃদ্ধির পথে প্রচন্ড রকম অন্তরায়।
কোমলমতি শিশু, কিশোর তরুণরা মানসিকভাবে আঘাতগ্রস্ত হচ্ছে। আগামী প্রজন্মের শিশু-কিশোর, তরুণদের সুকুমার বৃত্তির ব্যাঘাত ঘটছে।
দীর্ঘ সময় ধরে চলে আসা এ অব্যবস্থাপনা শিক্ষার পরিবেশকে ব্যাহত করছে। এ বিষয়ে দেশের তদারক প্রতিষ্ঠানগুলো যেন এক প্রকার নির্বিকার, নির্জীব। অতি সম্প্রতি ঢাকার ন্যাশনাল হাসপাতালে একজন শিক্ষার্থীর মৃত্যুকে কেন্দ্র করে পুরোন ঢাকার শতবর্ষী এক স্কুলে হামলা করে কিছু উচ্ছৃঙ্খল ছাত্র। পরীক্ষা ও শিক্ষা কার্যক্রম ১৩ দিন বন্ধ থেকে পুনরায় ৭ ডিসেম্বর চালু হয়। ছাত্রদের হামলায় বেশ কটি শ্রেণি কক্ষ, অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয়। দুষ্ট ছাত্ররা ক্যান্টিনে হামলা করে ক্যাশের টাকা-পয়সা লুটে নেয়। যারা আগামী দিনের বাংলাদেশ গড়বে, দেশকে বহুদূর এগিয়ে নেবে, বিশ্ব দরবারে জাতির মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে ভ্যানগার্ড হবে। আমাদের সেই সকল কোমলমতি ছাত্রদের এমন আচরণ জাতির জন্য এক অশনিসংকেত।
আমরা দেখতে পাচ্ছি, প্রায় গত দুই যুগ ধরেই শিক্ষার অতিমাত্রায় বাণিজ্যমুখিতা, অভিভাবকদের করেছে নিদারুণ অসহায়। রাজধানীর ঐতিহ্যবাহী এ স্কুল-কলেজ গুলোর প্রতিটিতে ২০-৩০ হাজার শিক্ষার্থী রয়েছে।
শত কোটি টাকার বেতন-ভাতা, ভর্তি ও কোচিং বাণিজ্য, ডোনেশন নামের অর্থ আদায়ের অপসংস্কৃতি, যা ঘুণে ধরা সমাজকে কুড়ে কুড়ে খাচ্ছে বহুকাল ধরে। সমাজ বিধ্বংসী এ নোংড়া প্রথা থেকে বের হয়ে আসা এখন সময়ের দাবি। বাবা-মা তাদের আদরের সন্তানদের ভালো একটি স্কুলে ভর্তি করাতে ৫-৭ লাখ টাকা পর্যন্ত ঘুষ দিতে প্রস্তুত, শুধু সামাজিক মর্যাদা বাড়াতে। যা একটি জাতির শিক্ষা নৈতিকতা কোন পর্যায়ে পৌছেছে তা খুব সহজেই অনুমেয়।
অভিভাবক হিসেবে আমাদের অসম প্রতিযোগিতা পূর্ণ অস্থির মানসিকতার অপনোদন ঘটাতে প্রয়োজন। তথাকথিত সামাজিক মর্যাদা বাড়াতে গিয়ে আমরা আমাদের সন্তানদের সুকুমার বৃত্তির সলিল সমাধি করছি।
অধিকাংশ শিক্ষকদের শ্রেণিকক্ষে পাঠদানে পূর্ণাঙ্গ মনোযোগ নেই। তারা অর্থ উপার্জনে কোচিং বাণিজ্যে নিমগ্ন।
সমকালীন বাস্তবতায়, বর্তমান জাতীয়-আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটে, আর্থ সামাজিক প্রেক্ষিতে বাজারদরের ঊর্ধ্বগতি চলমান। জীবন ধারণ পদ্ধতির প্রতিনিয়ত পরিবর্তন কোনো অংশে কম দায়ী নয়। এ বিষয়গুলো সামনে রেখে শিক্ষাসংশ্লিষ্ট সরকারের ঊর্ধ্বতন নীতি নির্ধারকগণ সুনজর দেবেন আগামী প্রজন্মকে বাঁচাতে। সংবাদপত্রে প্রকাশ, শুধু শিক্ষক নিয়োগ দিয়ে স্কুল কমিটির নীতি-নির্ধারকগণ ৩০০ কোটি টাকা হাতিয়েছেন।
আগামীর বাংলাদেশের জন্য সুস্থ জাতি বিনির্মাণে তরুণ প্রজন্মের কান্ডারীদের মাঝে সুশিক্ষার প্রকৃত আলোর-বাতাবরণ তৈরিতে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট বিভাগ ও দুদকের অনুসন্ধান প্রয়োজন, শিক্ষার মান ধরে রাখার লক্ষ্যে। শিক্ষাবর্ষ শুরুর আগেই রুটিন বাণিজ্যের কথা শোনা যায়। মানুষ গড়ার কারিগরদের মানসিকতা যদি এমন হয় তবে জাতি পথ হারাবে সুনিশ্চিত।
টিউশনি ও কোচিং এ অধিক চাহিদাসম্পন্ন বিষয়গুলোর শিক্ষকগণ অর্থ উপার্জনে অসম প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হন। শিক্ষকদের মাঝে মনস্তাত্ত্বিক দূরত্ব তৈরি হয়, যার নেতিবাচক প্রভাবে শিক্ষার্থীরা ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
সরকার কর্তৃক ২০১৩ সালে প্রণীত কোচিং-টিউশনি নীতিমালার যথাযথ প্রয়োগ দৃশ্যমান নয়।
বারবার শিক্ষা কারিকুলাম পরিবর্তন ও সংস্কারের ফলে নতুন এ পদ্ধতির সঙ্গে খাপ খাওয়াতে অসুবিধা হচ্ছে ছাত্র-শিক্ষদের। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের এমন অস্থিশীল পরিবেশ ৫ আগস্ট বিপ্লব পরবর্তী পর্যায়ে খুব বেশি দৃশ্যমান। যা গত দেড় দশকের পুঞ্জীভূত ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ বলে মনে করেন দেশের
শিক্ষাবিদগন।
সুশিক্ষা একটি জাতির মেরুদন্ড। একটি স্বপ্ন বিজয়ী জাতিকে বাঁচিয়ে রাখতে কিছু সুদূরপ্রসারী কর্ম- পরিকল্পনা প্রণয়ন জরুরি। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রাতিষ্ঠানিক শৃঙ্খলা বজায় রাখতে অঞ্চলভিত্তিক ও পার্শ্ববর্তী প্রতিটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রধান, অভিভাবক প্রতিনিধি, সর্বজনশ্রদ্ধেয় শিক্ষাবিদ এবং স্থানীয় শিক্ষাবান্ধব তরুণ রাজনীতিবিদদের সমন্বয়ে তাৎক্ষণিক সমস্যা সমাধানের জন্য শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে কমিটি গঠন করা যেতে পারে। তরুণ শিক্ষার্থীদের মানসিক উন্নয়নে প্রতিটি স্কুলের একজন সাইক্যাট্রিক নিয়োগ দেওয়া।
ভারতবর্ষে পশ্চিমা আধুনিক শিক্ষার অনুপ্রবেশ ইউরোপিয়দের হাত ধরে। ইতিহাস ঘাঁটলে জানা যায় ১৬শ’ শতকের দিকে পাশ্চাত্যের বণিক শ্রেণির লোকেরা উপমহাদেশের এই অঞ্চলে ব্যবসা-বাণিজ্যের জন্য আসে, সঙ্গে নিয়ে আসে তাদের কৃষ্টি-কালচার ও আঞ্চলিক প্রথার কলোনিয়াল উপাদান।
তাদের সঙ্গে আসেন পরিবারের সদস্য ও পুরোহিত-পাদ্রীগণ। ভাষা ও সংস্কৃতির ভিন্নতার কারণে তারা তাদের সামাজিক মিথস্ক্রিয়া ও বাণিজ্যিক স্বার্থে স্থানীয়দের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করতে বাধাগ্রস্ত হয়।
স্থানীয় জনগণের সাথে ব্যবসায়িক স্বার্থে আন্তঃযোগাযোগ বৃদ্ধির লক্ষ্যে পাদ্রীদের নিজস্ব তত্ত্বাবধানে চার্চের ব্যবস্থাপনায় কিছু পাঠশালা প্রকৃতির শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠে। সময়ের ব্যবধানে ব্যবসায়িক ও ধর্মীয় স্বার্থে ভারতবর্ষের বিভিন্ন ভৌগোলিক অঞ্চলে তারা ছড়িয়ে-ছিটিয়ে যায় এবং বসতি স্থাপন করে।
১৭৫৭ সালে পলাশীর আম্রকাননে বাংলার শেষ নবাব সিরাজউদ্দৌলার পতনের পর ইংরেজ বেনিয়া শ্রেণীর শাসনের সূত্রপাত হয় বাংলা, বিহার ও উরিশ্যা অঞ্চলে।
মুসলিমদের কাছ থেকে শাসন ক্ষমতা ছিনিয়ে নেয়ার পর তৎকালীন মুসলিম নেতৃবৃন্দের দাবীর মুখে ১৭৮০ সালে কলিকাতা আলীয়া মাদরাসা প্রতিষ্ঠা করে। যদিও ভারতবর্ষে প্রাচীন কাল থেকই দরসে নেজামীর শিক্ষা পদ্ধতি বিরাজমান ছিল। ছিল টোল ও মক্তবে প্রাথমিক শিক্ষা সংস্কৃতি, এ প্রতিষ্ঠানগুলোতে ধর্মীয় শিক্ষার পাশাপাশি কিছু জীবন ঘনিষ্ঠ বিষয়াদি পগানো হতো। দরসে নেজামী শিক্ষা কাঠামোর সাথে যোগ হয় ব্রিটিশ প্রবর্তিত আলীয়া পদ্ধতি।
কালের স্রোতে বহুঘাত প্রতিঘাত মাড়িয়ে ১৮৩০ সালে ব্রিটিশ ভারত সরকার একটি শিক্ষানীতি প্রণয়ন করে। এই নীতিমালার আলোকে ১০ এপ্রিল ১৮৩৫ সালে লর্ড বেন্টিকের নিকট এক বিশেষজ্ঞ প্রতিবেদনে বলা হয়, সরকারের প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে বাংলা অঞ্চলের জনবহুল শহরগুলোতে ইংরেজি ও বিজ্ঞান শিক্ষার জন্য কিছু বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা প্রস্তাব দেয়া হয়।
এরই ধারাবাহিকতায় ১৫ জুলাই ১৮৩৫ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় ঢাকা কলেজিয়েট স্কুল। এ স্কুল প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে ঢাকা ও তদঞ্চলীয় জন মানসপটে এক রেনেসাঁ তৈরি হয়। প্রত্যন্ত অঞ্চলের শিক্ষানুরাগী তরুণরা ছুটে আসে ঢাকায়। জ্ঞানপিপাসু বঙ্গদেশীয় যুব সমাজ স্বাদ পেতে শুরু করে পাশ্চাত্যের কলা বিজ্ঞান, সমাজ তত্ত্ব, দর্শন ও আধুনিক জ্ঞান-বিজ্ঞানের।
শিক্ষা যতই এগিয়ে যায়, পাল্টে যেতে থাকে সমাজের চালচিত্র। সে সময়ের গভর্নর জেনারেল লর্ড অকল্যান্ড এবং “জেনারেল কমিটি অব পাবলিক ইন্সট্রাকশন” বড় বড় শহরগুলোতে কেন্দ্রীয় কলেজ প্রতিষ্ঠার সুপারিশ করেন। যে কলেজগুলোতে অন্যান্য বিষয়ের সঙ্গে উচ্চতর ইংরেজি ভাষা শিক্ষা দেওয়া হবে। ১৮৪১ সালে প্রতিষ্ঠিত ইংলিশ স্কুলকে কলেজে রূপান্তর করা হয়। পূর্ব বাংলায় শিক্ষার আলো ছড়িয়ে দিতে, পশ্চিমা আধুনিক শিক্ষার মিছিলে শামিল হয় রংপুরে কারমাইকেল কলেজ, পাবনার এডওয়ার্ড কলেজ, খুলনার বিএল কলেজ, বরিশালের বিএম কলেজ, কুমিল্লার ভিক্টোরিয়া কলেজ।
ঢাকা হয়ে ওঠে জ্ঞানের রাজধানী এবং পূর্ববাংলার ইংরেজি শিক্ষার প্রাণকেন্দ্র। সময়ের হাত ধরে জাতির প্রয়োজনে ১৯২১ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। এ অঞ্চলে খুব দ্রুত শিক্ষা বিস্তারের ফলে, ঢাকার বাইরে থেকেও ছাত্ররা এ শহরে এসে থিতু হয়। পূর্ববাংলার স্কুল-কলেজ পরিদর্শক দল তাদের এক প্রতিবেদনে (১৮৫৯-৬০ইং) বলেন, ঢাকার স্কুল ও কলেজে যা পড়ানো হয়, তা মানের দিক থেকে লন্ডনের স্কুল-কলেজের সমতুল্য।
ছাত্রদেরকে জ্ঞানের পাঁচটি শাখায় পরীক্ষা দিতে হতো। তাদেরকে পড়ানো হতো, ইংরেজি, ইতিহাস, ভূগোল-প্রাকৃতিক বিজ্ঞান, গণিত ও নৈতিক শিক্ষা। এই বিষয়গুলোর পড়াশোনার মান ছিল অত্যন্ত উঁচু। সব বিষয়ে ছাত্রদের পাস করতে হতো, কোনো এক বিষয়ে আকৃতকার্য হলে প্রমোশন দেওয়া হতো না।
পাশাপাশি ভারতবর্ষের প্রাচীন শিক্ষা পদ্ধতি মাদরাসা ও টোল শিক্ষাও ছিল চলমান।
তৎকালীন শিক্ষানুরাগী মুসলিম নেতৃবৃন্দের দাবীর মুখে আরবী ও ফার্সী সিলেবাসে অন্তর্ভুক্ত করা হয়।
সে সময়ের প্রতিষ্ঠানগুলো মানরক্ষায় ছিল আপোসহীন। ঢাকার ঐতিহ্যবাহী স্কুল ও কলেজ গুলোর শিক্ষার প্রতিটি স্তর ছিল আন্তর্জাতিক মানে উত্তীর্ণ। শুধু রাজধানী ঢাকায় নয়, ব্রিটিশ বাংলায় প্রতিষ্ঠিত প্রতিটি প্রাচীন স্কুল ও কলেজে শিক্ষার মানের যে ঐতিহ্য ছিল তা ফিরিয়ে আনতে হবে। দেশ-জাতির কল্যাণে প্রতিষ্ঠানগুলো যেন আবারও তার ঐতিহাসিক ভূমিকা রাখতে পারে।
বিগত প্রায় অর্ধশতাব্দীকাল ধরেই বাংলাদেশের শিক্ষার প্রায় সর্বক্ষেত্রেই বেহাল দশা। দীর্ঘকাল ধরে চলে আসা অনিয়মই এখন নিয়ম।
সব আমলেই অতি দলীয়করণ ও স্বজনপ্রীতির কারণে মেধাবীরা শিক্ষাবিমুখ হয়েছে বারংবার।
রাজধানীর ঐতিহ্যবাহী স্কুল-কলেজ গুলোর শিক্ষার মান ধরে রাখতে বন্ধ হোক কোচিং বাণিজ্য, ভর্তি বাণিজ্য, তদবির বাণিজ্য, স্বজনপ্রীতি এবং পদোন্নতিতে বন্ধ হোক জ্যেষ্ঠতা লঙ্ঘন।
দেশের প্রথিতযশা শিক্ষাবিদদের প্রত্যক্ষ নেতৃত্বে কমিশন গঠন করে তাদের সুচিন্তিত মতামতের আলোকে আশু ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য। মনে রাখতে হবে এ ঐতিহ্যবাহী প্রতিষ্ঠানগুলো থেকেই আন্তর্জাতিক মানের স্কলার বিজ্ঞানীদের শিক্ষা জীবনের অভিষেক হয়েছে, যারা আজ দ্যুতি ছড়ায় দুনিয়া জুড়ে।
লেখক: সাংবাদিক ও অধ্যাপক
