মো. আবু হানিফ : বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্ক ঐতিহাসিক, ভৌগোলিক ও অর্থনৈতিকভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দুই দেশের মানুষের মধ্যে রয়েছে দীর্ঘদিনের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক যোগাযোগ। কিন্তু গত দুই বছরে এই সম্পর্কের মধ্যে যে অস্বস্তি, অবিশ্বাস ও টানাপোড়েন তৈরি হয়েছে, তার অন্যতম প্রধান কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে শেখ হাসিনা ইস্যু।
বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগের সভাপতি মানবতাবিরোধী অপরাধে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি শেখ হাসিনা বর্তমানে ভারতে অবস্থান করছেন। ২০২৫ সালের নভেম্বরে বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল তাঁকে ২০২৪ সালের আন্দোলন দমনের ঘটনায় মানবতাবিরোধী অপরাধে দোষী সাব্যস্ত করে মৃত্যুদণ্ড দেয়। তিনি অবশ্য এই রায়কে রাজনৈতিকভাবে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে প্রত্যাখ্যান করেছেন। এখান থেকেই শুরু হচ্ছে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের অন্যতম কঠিন কূটনৈতিক অধ্যায়।
একজন ব্যক্তিকে ঘিরে দুই দেশের সম্পর্ক
শেখ হাসিনা ২০২৪ সালের আগস্টে বাংলাদেশ থেকে ভারতে যাওয়ার পর থেকে সেখানেই অবস্থান করছেন। বাংলাদেশ তাঁর প্রত্যর্পণ চেয়ে ভারতের কাছে আনুষ্ঠানিক আবেদন করেছে। ভারত জানিয়েছে, বাংলাদেশের অনুরোধ তারা পেয়েছে এবং নিজস্ব আইন ও বিচারিক প্রক্রিয়া অনুযায়ী বিষয়টি পর্যালোচনা করছে।
কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে—এই পরিস্থিতি কতদিন চলবে? বাংলাদেশে একজন সাবেক প্রধানমন্ত্রী যখন একটি গুরুতর অপরাধে দণ্ডিত হয়েছেন এবং তাঁর বিরুদ্ধে দেশের আদালতের রায় কার্যকর হওয়ার অপেক্ষায় রয়েছে, তখন তিনি যদি প্রতিবেশী একটি দেশে অবস্থান করেন এবং সেখান থেকে বাংলাদেশের রাজনীতি নিয়ে নিয়মিত বক্তব্য দিতে থাকেন, তাহলে স্বাভাবিকভাবেই দুই দেশের সম্পর্কে অস্বস্তি তৈরি হবে।
বিশেষ করে আওয়ামী লীগ বর্তমানে বাংলাদেশে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে নিষেধাজ্ঞার মধ্যে রয়েছে। সেই দলের সভাপতি মানবতাবিরোধী অপরাধে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি শেখ হাসিনা যদি ভারতের মাটিতে বসে দলীয় রাজনীতি নিয়ে বক্তব্য দেন, দলের নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের দাবি জানান কিংবা দেশে ফেরার রাজনৈতিক বার্তা দেন—তাহলে বাংলাদেশের জনগণের একটি বড় অংশের মধ্যে প্রশ্ন তৈরি হওয়া স্বাভাবিক।
ভারতের মাটিতে রাজনৈতিক বক্তব্য—দিল্লির জন্যও কি অস্বস্তিকর নয়?
সম্প্রতি দিল্লিতে আয়োজিত একটি অনুষ্ঠানে শেখ হাসিনা অডিও বক্তব্য দেন। সেখানে তিনি আওয়ামী লীগের ওপর থাকা নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের দাবি জানান এবং বাংলাদেশে ফেরার ইচ্ছার কথাও বলেন। ঘটনাটিকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশ সরকার তীব্র প্রতিক্রিয়া জানায় এবং এটিকে বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বের প্রতি আঘাত হিসেবে উল্লেখ করে। ভারত অবশ্য স্পষ্ট করেছে, ওই অনুষ্ঠান ভারত সরকার আয়োজন করেনি এবং অনুষ্ঠানে প্রকাশিত বক্তব্যের সঙ্গে ভারতের সরকারের কোনো সম্পৃক্ততা বা সমর্থন নেই।
তবে কূটনীতিতে শুধু সরকারের আনুষ্ঠানিক অবস্থানই সবকিছু নয়। কোনো কর্মকাণ্ডের রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়াও গুরুত্বপূর্ণ। ভারতের মাটিতে বসে বাংলাদেশের একজন দণ্ডিত সাবেক প্রধানমন্ত্রী যখন সক্রিয় রাজনৈতিক বক্তব্য দেন, তখন বাংলাদেশের মানুষের একটি অংশ সেটিকে কীভাবে দেখবে—সেটিও দিল্লির বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন। কারণ, বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক কোনো একক রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সম্পর্ক নয়; এটি দুই দেশের জনগণের সম্পর্ক।
ক্ষমা প্রার্থনা বা অনুশোচনার প্রশ্ন
শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে বাংলাদেশের আদালতে যে অভিযোগ ও বিচার হয়েছে, তা নিয়ে তাঁর অবস্থানও গুরুত্বপূর্ণ। তিনি অভিযোগগুলো প্রত্যাখ্যান করেছেন এবং রায়কে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলেছেন।
কিন্তু বাংলাদেশের রাজনীতিতে তাঁর ভূমিকা এবং ২০২৪ সালের ঘটনাবলি নিয়ে যে গভীর ক্ষত তৈরি হয়েছে, সেটি শুধু রাজনৈতিক বক্তব্য দিয়ে মুছে ফেলা সম্ভব নয়।
যদি কোনো রাজনৈতিক নেতা তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা গুরুতর অভিযোগের পরও নিজের অবস্থান পরিবর্তন না করেন, অনুশোচনা বা দায় স্বীকারের কোনো বার্তা না দেন এবং একই সঙ্গে বিদেশের মাটিতে বসে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড চালিয়ে যান—তাহলে স্বাভাবিকভাবেই তাঁর প্রতি জনমনে ক্ষোভ আরও বাড়তে পারে।
এখানে প্রশ্নটি শুধু শেখ হাসিনাকে নিয়ে নয়। প্রশ্ন হলো—একটি দেশের রাজনৈতিক সংকট ও বিচারিক প্রক্রিয়াকে অন্য একটি দেশের ভূখণ্ড থেকে কতটা প্রভাবিত করা উচিত?
ভারতের জন্য কূটনৈতিক বোঝা কেন?
ভারত নিঃসন্দেহে তার ভূখণ্ডে কাকে আশ্রয় দেবে, সে বিষয়ে নিজস্ব সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার রাখে। কিন্তু একই সঙ্গে ভারতের একটি বড় কূটনৈতিক স্বার্থ হলো বাংলাদেশের সঙ্গে স্থিতিশীল ও পারস্পরিক সম্মানভিত্তিক সম্পর্ক বজায় রাখা।
আজ বাংলাদেশে এমন একটি বাস্তবতা তৈরি হয়েছে, যেখানে শেখ হাসিনার ভারতে অবস্থানকে কেন্দ্র করে দুই দেশের মধ্যে নিয়মিত কূটনৈতিক টানাপোড়েন হচ্ছে। বাংলাদেশের পক্ষ থেকে প্রত্যর্পণের দাবি আসছে, ভারত আইনি প্রক্রিয়ার কথা বলছে; আবার শেখ হাসিনার কোনো বক্তব্য বা রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের পর নতুন করে উত্তেজনা তৈরি হচ্ছে।
এভাবে চলতে থাকলে প্রশ্ন উঠতেই পারে—শেখ হাসিনাকে আশ্রয় দেওয়ার সিদ্ধান্ত কি ধীরে ধীরে ভারতের জন্য একটি কূটনৈতিক বোঝায় পরিণত হচ্ছে?
একজন ব্যক্তিকে কেন্দ্র করে যদি দুই দেশের বাণিজ্য, সীমান্ত, পানি, নিরাপত্তা, আঞ্চলিক সহযোগিতা ও জনগণের পারস্পরিক যোগাযোগের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো বারবার রাজনৈতিক উত্তেজনার আড়ালে চলে যায়, তাহলে সেটি কোনো পক্ষের জন্যই ভালো ফল বয়ে আনবে না।
বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক ব্যক্তি নির্ভর হওয়া উচিত নয়
ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক শুধু শেখ হাসিনার সময়ের সম্পর্ক নয়। আবার বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক কোনো একটি দলের সঙ্গে সম্পর্কও নয়।
সরকার পরিবর্তন হবে। রাজনৈতিক দল ক্ষমতায় আসবে-যাবে। কিন্তু প্রতিবেশী হিসেবে বাংলাদেশ ও ভারতকে পাশাপাশি থাকতে হবে। তাই দুই দেশের সম্পর্ককে কোনো ব্যক্তি, দল বা সরকারের বাইরে নিয়ে গিয়ে রাষ্ট্রীয় স্বার্থ, জনগণের স্বার্থ, সার্বভৌমত্ব ও পারস্পরিক সম্মানের ভিত্তিতে পুনর্গঠন করা জরুরি।
বাংলাদেশও ভারতের সঙ্গে সুসম্পর্ক চায়—কিন্তু সেই সম্পর্ক হতে হবে সমতার ভিত্তিতে। ভারতেরও নিশ্চয়ই স্বার্থ রয়েছে বাংলাদেশের সঙ্গে স্থিতিশীল সম্পর্ক বজায় রাখার। সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীও ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নের জন্য একটি অনুকূল পরিবেশ তৈরির প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছেন।
সমাধান কোথায়?
শেখ হাসিনা ইস্যুর একটি গ্রহণযোগ্য কূটনৈতিক সমাধান এখন দুই দেশের জন্যই প্রয়োজন।
বাংলাদেশ তার বিচারিক অবস্থান ও প্রত্যর্পণের দাবি তুলে ধরেছে। ভারত তার আইন ও কূটনৈতিক বাস্তবতার আলোকে বিষয়টি বিবেচনা করছে। কিন্তু দীর্ঘসূত্রতা যত বাড়বে, ততই দুই দেশের মধ্যে অবিশ্বাস বাড়ার আশঙ্কা থাকবে।
আর শেখ হাসিনার জন্যও সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—তিনি যদি সত্যিই দেশে ফেরার কথা বলেন, তাহলে সেটি রাজনৈতিক বক্তব্যের বাইরে বাস্তব আইনি প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়েই হতে হবে।
শেষ পর্যন্ত তাঁকে বাংলাদেশের বিচারব্যবস্থার মুখোমুখি হতে হবে কি না—সেটি বাংলাদেশের আইন ও আদালতের বিষয়। কিন্তু তাঁর ভারতে অবস্থান এবং সেখান থেকে রাজনৈতিক বক্তব্য দেওয়া যে দুই দেশের সম্পর্কে নতুন নতুন প্রশ্ন তৈরি করছে, তা অস্বীকার করার সুযোগ নেই। ভারতের জন্য শেখ হাসিনা হয়তো এখনো একজন সাবেক মিত্র ও রাজনৈতিক আশ্রিত। কিন্তু বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের বাস্তবতায় তাঁকে ঘিরে তৈরি হওয়া সংকট ক্রমেই একটি বড় কূটনৈতিক বোঝায় পরিণত হচ্ছে।
প্রশ্ন তাই থেকেই যায়—
একজন ব্যক্তিকে আশ্রয় দিয়ে ভারত কি দীর্ঘমেয়াদে বাংলাদেশের সঙ্গে তার গুরুত্বপূর্ণ সম্পর্ককে ঝুঁকির মুখে ফেলবে, নাকি শেখ হাসিনা ইস্যুর একটি গ্রহণযোগ্য সমাধানের পথ খুঁজবে?
এই প্রশ্নের উত্তর শুধু দিল্লি বা ঢাকার জন্য নয়— দুই দেশের ভবিষ্যৎ সম্পর্কের জন্যও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
লেখক, সম্পাদক – সাপ্তাহিক মুক্তকাল।


