Skip to content
প্রকাশ- November 2, 2026 , 14:23 pm
মুক্তমত

ঐক্য ভাঙার রাজনীতি, নাকি আমাদের আত্মবিস্মৃতি?

ঐক্য ভাঙার রাজনীতি, নাকি আমাদের আত্মবিস্মৃতি?

ইসলামের ইতিহাসের দিকে তাকালে আমরা দেখি, মুসলিম উম্মাহর সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল তাদের ঈমান, চরিত্র এবং ঐক্য। সেই ঐক্যের শক্তিতেই মরুর বুকে একটি ছোট্ট জনপদ বিশ্বসভ্যতার নেতৃত্ব দিয়েছিল। অথচ আজ একই ইসলামের পতাকাতলে দাঁড়িয়েও আমরা অসংখ্য দল, উপদল, জোট আর পাল্টা জোটে বিভক্ত। একজন সাধারণ মুসলিম হিসেবে এই দৃশ্য শুধু হতাশার নয়, হৃদয়ভাঙারও।
প্রশ্ন জাগে, আমাদের লক্ষ্য কি সত্যিই আল্লাহর সন্তুষ্টি? নাকি দল, পদ, প্রভাব এবং ক্ষমতার হিসাবই ধীরে ধীরে আমাদের চিন্তা ও কর্মকে নিয়ন্ত্রণ করছে?
ইসলাম আমাদের শিখিয়েছে, মুসলমান মুসলমানের ভাই। কিন্তু বাস্তবে আমরা দেখি, এক ভাই আরেক ভাইয়ের বিরুদ্ধে মঞ্চ গড়ে, বিবৃতি দেয়, অপপ্রচার চালায়, পরস্পরকে ছোট করতে ব্যস্ত থাকে। যে শক্তি অন্যায়ের বিরুদ্ধে ব্যয় হওয়ার কথা, তা আজ ব্যয় হচ্ছে নিজেদের বিরুদ্ধেই। এতে লাভ কার? ক্ষতি কার?
সবচেয়ে বড় ক্ষতি হচ্ছে সাধারণ মুসলিমের। তারা বিভ্রান্ত হয়, আস্থা হারায়, হতাশ হয়। যারা ইসলামের সৌন্দর্য দেখতে চায়, তারা অনেক সময় ইসলামের নামে চলা বিরোধ আর বিভক্তির দৃশ্যই বেশি দেখে। অথচ ইসলাম কখনো বিভেদের শিক্ষা দেয়নি। ইসলাম শিখিয়েছে ন্যায়, সহনশীলতা, শূরা, জবাবদিহি এবং উত্তম চরিত্র।
রাজনীতি যদি মানুষের কল্যাণের জন্য হয়, তবে সেখানে ক্ষমতা হবে আমানত, অহংকার নয়। নেতৃত্ব হবে সেবার প্রতীক, আধিপত্যের নয়। যারা নিজেদের মতপার্থক্য প্রজ্ঞা ও সহনশীলতার সঙ্গে সামলাতে পারেন না, জনগণ তাদের কাছ থেকে আরও বড় দায়িত্ব পালনের সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন তুলবেই। এটি কোনো বিদ্বেষের প্রশ্ন নয়, এটি জনগণের স্বাভাবিক প্রত্যাশা।
অনেকের বিশ্বাস, যখনই কোনো ইসলামি রাজনৈতিক শক্তি জনসমর্থন অর্জন করে বা রাষ্ট্র পরিচালনার সম্ভাবনার কাছাকাছি পৌঁছে, তখন নানা উপায়ে তাদের মধ্যে বিভক্তি সৃষ্টি করার চেষ্টা হয়। ইতিহাসে এমন অভিযোগ ও আলোচনা বহুবার এসেছে। তবে বাইরের কোনো ষড়যন্ত্র থাকুক বা না থাকুক, একটি বাস্তবতা অস্বীকার করার সুযোগ নেই। ভেতর যদি দুর্বল হয়, বাইরে থেকে আঘাত করাও সহজ হয়ে যায়। তাই আত্মসমালোচনা এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই।
আরেকটি বেদনাদায়ক প্রশ্নও মানুষের মুখে মুখে ঘোরে। আলেমসমাজ কি সবসময় সত্যের পক্ষে অটল থাকতে পারছেন? ইসলাম আমাদের শিক্ষা দেয়, একজন মুমিন আল্লাহ ছাড়া কাউকে ভয় করবে না। সত্যের পক্ষে দাঁড়ানোই একজন আলেমের মর্যাদা। তাই আলেমদের প্রতি মানুষের প্রত্যাশাও অনেক বড়। তারা হবেন ঐক্যের সেতুবন্ধন, বিভেদের নয়। তারা হবেন সত্যের কণ্ঠস্বর, ব্যক্তিস্বার্থের নয়।
আজ সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন নতুন কোনো দল নয়, নতুন কোনো জোটও নয়। প্রয়োজন নতুন মানসিকতা। এমন নেতৃত্ব, যারা নিজেদের আগে উম্মাহকে ভাববেন, দলীয় পরিচয়ের আগে ইসলামের পরিচয়কে ধারণ করবেন, ব্যক্তিগত স্বার্থের আগে জাতির কল্যাণকে প্রাধান্য দেবেন।
মুসলিম উম্মাহর শত্রু কখনো শুধু বাইরে থাকে না। বিভেদ, অহংকার, হিংসা, ক্ষমতার লোভ এবং আত্মকেন্দ্রিকতা যখন হৃদয়ে বাসা বাঁধে, তখন সেগুলোই সবচেয়ে ভয়ংকর শত্রু হয়ে ওঠে। যে জাতি নিজের ভেতরের দেয়াল ভাঙতে পারে না, সে বাইরের দেয়ালও ভাঙতে পারে না।
এখনও সময় আছে। আমরা যদি সত্যিই আল্লাহর সন্তুষ্টি চাই, তবে আমাদের ফিরে যেতে হবে কুরআন ও সুন্নাহর সেই শিক্ষায়, যেখানে ঐক্য ইবাদত, ন্যায়বিচার দায়িত্ব এবং উত্তম চরিত্রই দাওয়াতের সবচেয়ে শক্তিশালী ভাষা।
আসুন, আমরা দল নয়, উম্মাহকে বড় করি। ব্যক্তি নয়, আদর্শকে বড় করি। ক্ষমতা নয়, আল্লাহর সন্তুষ্টিকে জীবনের সর্বোচ্চ লক্ষ্য বানাই। কারণ ইতিহাস সাক্ষী, ঐক্যবদ্ধ মুসলিম উম্মাহকে পরাজিত করা কঠিন। কিন্তু বিভক্ত মুসলিম সমাজ নিজের শক্তিই নিজের হাতে ধ্বংস করে।
আল্লাহ আমাদের হৃদয়কে ঐক্যবদ্ধ করুন, সত্যের ওপর অবিচল রাখুন এবং এমন নেতৃত্ব দান করুন, যারা ইসলামের মর্যাদা রক্ষা করবে কথায় নয়, কাজে। আমিন।

– আব্দুর রহিম খান, গণমাধ্যম কর্মী

Advertisement

Advertisement