Skip to content
প্রকাশ- November 2, 2026 , 16:00 pm
ফিচার

বৃষ্টির দিনে খিচুড়ি খাওয়ার ঐতিহ্য

বৃষ্টির দিনে খিচুড়ি খাওয়ার ঐতিহ্য

জি. মোস্তফা ||

২০১৭ সালে ভারতের ব্র্যান্ড ফুড ঘোষণা করা খিচুড়ি। কাশ্মীরেও খিচুড়ি খুবই জনপ্রিয় খাবার। চাল ও ডালের মিশ্রণে এক ধরনের খাবার তৈরির কথা ভারতের প্রাচীন লেখায় পাওয়া যায়। খিচুড়িকে ব্যাখ্যা করতে প্রধানত দু’টি শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে। কৃসারান্না ও খিচ্ছা। ১২০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দে পাওয়া প্রত্নতাত্ত্বিক প্রমাণ অনুযায়ী ভারতে চাল ও ডাল এক সঙ্গে খাওয়ার প্রচলন ছিল। যদিও, চাল, ডাল আলাদাও খাওয়া হত সেই সময়। চাণক্যের লেখাতেও মৌর্য সম্রাট চন্দ্রগুপ্তের আমলে চাল, ডালের মিশ্রণে খিচুড়ি খাওয়ার উল্লেখ পাওয়া যায়। সুষম আহারের কথা প্রসঙ্গে চাণক্য লিখেছেন, এক প্রস্থ চাল (৬০০ গ্রাম মতো) ও সিকি প্রস্থ ডাল, ১/৬২ প্রস্থ নুন ও ১/১৬ প্রস্থ ঘি তৈরি খাবারই হল সুষম আহার। গ্রিক পরিব্রাজক মেগাস্থিনিসের লেখাতেও চন্দ্রগুপ্ত মৌর্য্যের রাজসভার হেঁশেলে চাল, ডাল এক সঙ্গে মিশিয়ে রান্নার উল্লেখ পাওয়া যায়।

Advertisement

পঞ্চদশ শতকে রুশ পরিব্রাজক নিকিতিনের লেখাতে দক্ষিণ ভারতে চাল-ডাল মিশিয়ে খাওয়ার প্রসঙ্গ উঠে এসেছে। সপ্তদশ শতকে ফরাসি পরিব্রাজক তাভেরনিয়ের লিখেছেন, সে সময় ভারতের প্রায় সব বাড়িতেই ‘খিচুড়ি’ খাওয়ার রেওয়াজ ছিল।

তবে খিচুড়িকে খিচুড়ি হিসেবে আজকের মতো জাঁকজমকপূর্ণভাবে খাওয়ার প্রচলন হয় মোগল মোগল শাসনামলে। মোগল শাসকদের কাছেও এটি পছন্দের খাবার ছিল। হেঁশেলেও বিশেষ স্থান ছিল খিচুড়ির। বাবর বা হুমায়ুনের সময়ে খিচুড়ির উল্লেখ পাওয়া না গেলেও আকবরের সময় থেকে মোগল হেঁশেলে খিচুড়ির উল্লেখ পাওয়া যায়। রাজকীয় হেঁশেলে বিভিন্ন প্রকার খিচু়ড়ি রান্নার কথা লিখেছেন আকবরের মন্ত্রী ও ঐতিহাসিক আবুল ফজল। আইন-ই-আকবরীতে বিভিন্ন প্রকার খিচুড়ির রেসিপিও পাওয়া যায়। এমনকী, ‘বীরবলের খিচুড়ি’ নামে একটি মজার গল্পেরও উল্লেখ পাওয়া যায় ওই বইয়ে।

মোগল হেঁশেলে জাহাঙ্গীরের প্রিয় বিশেষ ধরনের খিচু়ড়ি তৈরি করা হত বলেও জানা যায়। পেস্তা, কিসমিস দিয়ে তৈরি সেই খিচুড়িকে জাহাঙ্গীর নাম দিয়েছিলেন ‘লাজিজাঁ’। আবার আওরঙ্গজেবের প্রিয় ‘আলমগীরী খিচড়ি’র কথাও জানা যায়। যেখানে নাকি চাল, ডালের সঙ্গে মেশানো হত বিভিন্ন প্রকার মাছ, ডিম।

রাজকীয় খাবার হিসেবে হায়দারাবাদের নিজামের হেঁশেলেও জনপ্রিয় হয়েছিল খিচুড়ি। সেই খিচুড়ির পরতে পরতে খোঁজ মিলত সুস্বাদু গোশতের কিমার। ১৯ শতকে ভারতের এ লোভনীয় খাবার ইংল্যান্ডের দরবারে নিয়ে গিয়েছিলেন ব্রিটিশরা। জনপ্রিয় ইংলিশ ব্রেকফাস্ট হয়ে ওঠে ‘কেদেগিরি।’

বৃষ্টির দিনে খিচুড়ি খেতে কমবেশি সবাই ভালোবাসেন। চাল-ডালে ফুটিয়ে খিচুড়ি সহজেই রান্না করা যায়। আর তাই বৃষ্টি দেখলেই হাঁড়িতে যে কেউই বসিয়ে দেন খিচুড়ি। এটি একই সঙ্গে যেমন পেট ভরায়, তেমনই সুস্বাদুও। কিন্তু কখনও ভেবে দেখেছেন কি— বৃষ্টির দিনেই কেন খিচুড়ি খাওয়া হয়? কোথা থেকে এলো এ নিয়ম? চলুন জেনে নেওয়া যাক সে গল্প। শোনা যায়, ১২০০-১৮০০ সালের মধ্যবর্তী কোনো এক সময়ে বাংলায় খিচুড়ির আবির্ভাব। মনসামঙ্গল কাব্যে স্বয়ং শিব যে খাবারটির আবদার পার্বতীর কাছে করেছিলেন, তা হল খিচুড়ি।

তবে জনপ্রিয় ধারণা হল, বাঙলায় খিচুড়ি খাওয়া শুরু নাকি বাউলদের হাতে। এটি নাকি প্রধানত ছিল তাদের খাবার। এ ছন্নছাড়া মানুষ পথে-ঘাটে গান করতেন, আর দক্ষিণা হিসাবে পেতেন চাল-ডাল। তারা চাল ডাল একত্রে মিলিয়ে খুব দ্রুত ও ঝামেলাবিহীন রেঁধে ফেলতেন এবং খেতেন। পরে এ খাবারের নাম হয় খিচুড়ি। কিন্তু এটি ছিল তাদের রোজকার খাবার। তবে ইতিহাসের নানা পর্যায়ে আলাদা আলাদা করে খিচুড়ির উল্লেখ আছে। যেমন, সেলুকাস উল্লেখ করেছেন, ভারতীয় উপমহাদেশে চাল-ডাল মেশানো পদের কথা। আল বেরুনিও খিচুড়ির প্রসঙ্গ তুলেছেন তার লেখায়। মরক্কোর পর্যটক ইবন বতুতা খিচুড়ি বানানোর ক্ষেত্রে মুগডালের কথাও বলেছেন।

বর্ষা ও বৃষ্টির দিনে খিচুড়ি খাওয়ার সঙ্গে নাকি রয়েছে অন্য কাহিনি। গ্রামাঞ্চলে বর্ষার সময় চারপাশ পানিতে ভরে যেত। বৃষ্টি মাথায় নিয়ে পিচ্ছিল পথ পেরিয়ে দূরের বাজারে যাওয়া ছিল কষ্টকর। বাজার যেহেতু করা সম্ভব হত না, তাই ঘরে থাকা উপাদান দিয়েই, মানে চাল আর ডাল দিয়েই সহজে কিছু রেঁধে ফেলতেন গৃহিণীরা। এর ওপর বৃষ্টির কারণে উনুনে বার বার আগুন ধরানোও ছিল কষ্টকর। তাই একবার আগুন জ্বালিয়ে চাল-ডালের খিচুড়িই রান্না করতেন তারা। পরে ধীরে ধীরে এই খিচুড়িই হয়ে ওঠে অনেকের পছন্দের খাবার। তার সঙ্গে মেশানো শুরু হয় অন্যান্য জিনিস।

তবে এর পেছনে অন্য একটি বৈজ্ঞানিক কারণ আছে বলেও মনে করেন অনেকে। খিচুড়ি একটি গুরুপাক খাবার। এ খাবার খেলে হজমের নানা সমস্যা হতে পারে। তাই এ খাবার গরমে খাওয়া সমস্যার কারণ হতে পারে। তাই বৃষ্টিতে ঠান্ডা আবহাওয়ায় খিচুড়ি খাওয়ার চল হয়েছে বলে মনে করেন অনেকে। একই কারণে শীতেও এটি খাওয়া হয় বলে মনে করা হয়।

লেখক : সাংবাদিক

Advertisement

Leave a Comment

Your email address will not be published.