Skip to content
প্রকাশ- November 2, 2026 , 14:22 pm
ফিচার

রাজিব পরিবহন: দুর্ঘটনার পর দুর্ঘটনা, সমাধান কোথায়?

রাজিব পরিবহন: দুর্ঘটনার পর দুর্ঘটনা, সমাধান কোথায়?

মো. আবু হানিফ

জামালপুরের সড়কে রাজিব পরিবহনের বাস নিয়ে আলোচনা নতুন নয়। যাত্রী পরিবহনের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হিসেবে প্রতিদিন অসংখ্য মানুষ এই সার্ভিসের ওপর নির্ভর করেন। কিন্তু একের পর এক দুর্ঘটনা, প্রাণহানি এবং যাত্রীদের নিরাপত্তা নিয়ে অভিযোগ সামনে আসায় প্রশ্ন উঠছে—যাত্রীদের নিরাপদ যাত্রা নিশ্চিত করতে আসলে কোথায় ঘাটতি রয়ে যাচ্ছে?

সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো সেই প্রশ্নকে আরও সামনে নিয়ে এসেছে।

Advertisement

২০২৫ সালের জানুয়ারিতে জামালপুরের মহনপুর এলাকায় রাজিব বাসের ধাক্কায় ১২ বছর বয়সী এক শিশুর মৃত্যুর সংবাদ প্রকাশিত হয়। এরপর ২০২৫ সালের মার্চে জামালপুর সদর এলাকায় রাজিব বাস ও অটোরিকশার সংঘর্ষে একজন নিহত হওয়ার খবর পাওয়া যায়। ঘটনাটির পর বিক্ষুব্ধ মানুষ বাসে আগুনও দেয়।

২০২৬ সালের ২২ জুলাই সদর উপজেলার মুদিবাড়ি এলাকায় রাজিব পরিবহনের বাসের ধাক্কায় সিএনজির দুই যাত্রীর মৃত্যু হয়। মাত্র কয়েকদিন পর, ২৮ জুলাই রাজিব বাস সার্ভিসকে আরও নিরাপদ করতে মালিক, শ্রমিক, বিআরটিএ, পুলিশ এবং ট্রাফিক বিভাগের সংশ্লিষ্টদের নিয়ে পরামর্শ সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভা থেকে দুর্ঘটনা রোধে ১৩টি নির্দেশনা দেওয়ার কথা জানানো হয়।

কিন্তু সবচেয়ে বড় প্রশ্নটি এখানেই—নির্দেশনা দেওয়ার মাত্র এক মাসের মধ্যেই কি পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছিল?
৩১ আগস্ট লাহিড়ীকান্দায় ঘটে ভয়াবহ দুর্ঘটনা। রাজিব পরিবহনের একটি বাসের সঙ্গে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার সংঘর্ষের পর বাসটি উল্টে অটোরিকশার ওপর পড়ে। এতে চারজন নিহত এবং অন্তত ১০ জন আহত হন বলে জাতীয় সংবাদমাধ্যমে খবর প্রকাশিত হয়।

এই দুর্ঘটনার পর আবারও রাজিব পরিবহনের বিরুদ্ধে ক্ষোভ দেখা দেয়। স্থানীয়রা বাস চলাচল বন্ধ ও দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান। পরবর্তী সময়ে রাজিব পরিবহনের বাস চলাচল বন্ধের দাবিতে বিক্ষোভ ও বাস ভাঙচুরের ঘটনাও ঘটে।

১৩ দফায় কী ছিল?

জুলাইয়ের পরামর্শ সভায় রাজিব বাসকে নিরাপদ করতে যেসব উদ্যোগের কথা বলা হয়েছিল, তার মধ্যে ছিল সিটিং সার্ভিস চালু রাখা এবং দাঁড়িয়ে যাত্রী না নেওয়া, নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে নির্ধারিত গন্তব্যে পৌঁছানোর ব্যবস্থা, জিপিএস ট্র্যাকার ও ক্যামেরা স্থাপন এবং চালকদের ভারী যানবাহন চালানোর বৈধ লাইসেন্স নিশ্চিত করা।

এ ছাড়া চালক পরিবর্তন হলে মালিক সমিতি ও শ্রমিক ইউনিয়নকে জানানোর মতো ব্যবস্থার কথাও বলা হয়েছিল।
উদ্দেশ্য নিঃসন্দেহে ভালো। কিন্তু নির্দেশনা কাগজে থাকলেই হবে না, বাস্তবে তার প্রয়োগ হচ্ছে কি না—সেটিই মূল বিষয়।
তাহলে সমাধান কোথায়?

রাজিব পরিবহনের বিরুদ্ধে শুধু অভিযোগ করলেই সমস্যার সমাধান হবে না। আবার প্রতিটি দুর্ঘটনার দায়ও তদন্ত ছাড়া সরাসরি কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের ওপর চাপিয়ে দেওয়া উচিত নয়। প্রয়োজন স্বচ্ছ তদন্ত, জবাবদিহি এবং নিয়মিত তদারকি।

প্রথমত, প্রতিটি বাসের ফিটনেস ও যান্ত্রিক সক্ষমতা নিয়মিত পরীক্ষা করতে হবে। দ্বিতীয়ত, চালকের লাইসেন্স থাকলেই দায়িত্ব শেষ নয়; তার দক্ষতা, অভিজ্ঞতা ও কর্মঘণ্টাও বিবেচনায় নিতে হবে।

তৃতীয়ত, অতিরিক্ত গতি নিয়ন্ত্রণে জিপিএসের তথ্য নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করতে হবে। শুধু বাসে জিপিএস লাগিয়ে রাখলেই হবে না—কোন বাস কত গতিতে চলছে, নির্ধারিত সময়ের চেয়ে দ্রুত যাচ্ছে কি না, তা কর্তৃপক্ষকে দেখতে হবে।

চতুর্থত, চালকদের ওপর অতিরিক্ত ট্রিপের চাপ থাকলে সেটিও দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়াতে পারে। তাই চালকদের পর্যাপ্ত বিশ্রাম নিশ্চিত করা জরুরি।

পঞ্চমত, দুর্ঘটনা ঘটলে শুধু চালককে গ্রেপ্তার বা সাময়িকভাবে বাস বন্ধ করে বিষয়টি শেষ করে দেওয়া উচিত নয়। দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ চিহ্নিত করে মালিক, চালক, ব্যবস্থাপনা কিংবা অন্য কারও অবহেলা থাকলে যার যতটুকু দায়, সেই অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে হবে।

শুধু রাজিব নয়, পুরো পরিবহন ব্যবস্থার সংস্কার দরকার
একটি বিষয় মনে রাখা দরকার—সড়ক নিরাপত্তা শুধু একটি পরিবহন কোম্পানির সমস্যা নয়। এটি পুরো ব্যবস্থার সমস্যা।
বাস মালিককে দায়িত্বশীল হতে হবে, চালককে সতর্ক হতে হবে, যাত্রীকেও সচেতন হতে হবে এবং প্রশাসনকে কঠোরভাবে আইন প্রয়োগ করতে হবে। একই সঙ্গে বিআরটিএ, ট্রাফিক পুলিশ ও স্থানীয় প্রশাসনের নিয়মিত নজরদারি প্রয়োজন।

একটি বাসের সময়মতো গন্তব্যে পৌঁছানো কখনোই একজন মানুষের জীবনের চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে না।

রাজিব পরিবহনের ক্ষেত্রে ইতোমধ্যে ১৩ দফা নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। এখন প্রয়োজন সেই নির্দেশনাগুলো বাস্তবায়নের দৃশ্যমান প্রমাণ। বাসে জিপিএস লাগানো হয়েছে কি না—তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো, জিপিএসের তথ্য দেখে বেপরোয়া গতি বন্ধ করা হচ্ছে কি না। চালকের ভারী লাইসেন্স আছে কি না—তার পাশাপাশি গুরুত্বপূর্ণ হলো তিনি নিরাপদে গাড়ি চালাচ্ছেন কি না।

কারণ দুর্ঘটনার পর ক্ষতিপূরণ, মামলা কিংবা সাময়িক বাস বন্ধ—কোনোটিই একটি হারানো প্রাণ ফিরিয়ে দিতে পারে না।

শেষ কথা;

রাজিব পরিবহন জামালপুরের মানুষের প্রয়োজনীয় একটি পরিবহন সেবা। তাই এটিকে বন্ধ করে দেওয়া নয়, বরং নিরাপদ, আধুনিক ও জবাবদিহিমূলক পরিবহনে পরিণত করাই হওয়া উচিত মূল লক্ষ্য। তবে সেই লক্ষ্য অর্জন করতে হলে প্রতিশ্রুতি নয়, বাস্তবায়ন দরকার। সভা নয়, নিয়মিত মনিটরিং দরকার। নির্দেশনা নয়, কঠোর প্রয়োগ দরকার।

সবশেষে প্রশ্ন থেকেই যায়, আর কত প্রাণ গেলে আমরা বুঝব? নিরাপদ সড়ক কোনো বিলাসিতা নয়—এটি মানুষের মৌলিক অধিকার।

লেখক- সম্পাদক, সাপ্তাহিক মুক্তকাল

Advertisement