Skip to content
প্রকাশ- November 2, 2026 , 15:10 pm
ফিচার

‘বিষাদ-সিন্ধু’ ও বিশ্ব মানবহৃদয়ের আর্তনাদের স্রোত

‘বিষাদ-সিন্ধু’ ও বিশ্ব মানবহৃদয়ের আর্তনাদের স্রোত

মো: ইমরান হোসেন ।।

প্রথম পর্ব: মীর মশাররফ হোসেন এর ‘বিষাদ-সিন্ধু’ নিয়তি-লাঞ্ছিত মানবভাগ্যের এক মর্মস্পর্শী ও ইতিহাস আশ্রিত গদ্যধর্মী মহাকাব্য। একদিকে নীতি, ন্যায় ও সত্য এবং অপরদিকে মানবের রিরংসা-কামনা-বাসনা ও শিল্প বোধের দায়—এই দুই টানাপোড়েনে মীর মশাররফ দ্বিধাবিভক্ত হয়েছেন। ঔপন্যাসিক মশাররফের ধর্মীয়চেতনা ও স্বজাতির প্রতি দায়বদ্ধতা তাঁকে অনিবার্যভাবে হযেেতর দৌহিত্র ইমাম হাসান-হোসেনের পক্ষাবলম্বী করে তুলেছে, এখানে সত্যের জয়-বন্দনায় তাঁর মনোযোগ গভীরভাবে নিবেদিত। শিল্পী মশাররফের সহানুভূতি ও মমত্ববোধ যে এজিদের প্রতিও ধাবিত, তাও বিস্মৃত হওয়া চলে না। বাহ্যত ইমাম হাসান-হোসেনের প্রতি তাঁর পক্ষপাত, কিন্তু শিল্প-মনোরাজ্যের গভীরে ‘দুরাত্মা’ এজিদই আন্তরিক অনুরাগ ও মমতায় প্রতিষ্ঠিত বলে সমালোচকগণ মনে করেন। শিল্পী মশাররফের অভিপ্রায়ের বিজয় সাধিত হয়েছে এই ধর্মাশ্রিত কাহিনীর শিল্প-রূপায়ণে। ইতিহাসের মর্মান্তিক ট্রাজিক-ঘটনা শেষ পর্যন্ত পরিণত হয়েছে এক প্রেম-পতঙ্গের বিষাদে আত্মহননের আধুনিক রূপকথায়।
তিন পর্বে বিভক্ত ‘বিষাদ-সিন্ধু’র ‘মহরম পর্বে’র পরিচ্ছেদ সংখ্যা ছাব্বিশ, ‘উদ্ধারপর্বে’র ত্রিশ ও ‘এজিদবধ পর্বে’র পাঁচ। অবশ্য ‘মহরম পর্বে’র ‘উপক্রমণিকা’ ও ‘উদ্ধার পর্বে’র ‘উপসংহার’কে ধরলে আরো দুটি অধ্যায় বৃদ্ধি পাবে। এই গ্রন্থে পরিচ্ছেদ চিহ্নিত হয়েছে ‘প্রবাহ’ নামে।
মূলত ‘মহরম পর্বে’ বর্ণিত হয়েছে দামেস্ক এর অধিপতি মাবিয়ার পুত্র নিষ্ঠুর এজিদের প্রণয়াসক্তি, প্রেমে ব্যর্থতা এবং তার পরিণাম। হাসানপত্নী জয়নাবের প্রতি এজিদের প্রণয় ও দুর্বলতা থাকলেও জয়নাবকে সে করায়ত্ত করতে সক্ষম হয়নি। এই ব্যর্থতার সূত্রে হাসানের প্রতি সে বৈরী মনোভাব পোষণ করে এবং তার ষড়যন্ত্র-কূটকৌশলে হাসানকে জীবন দিতে হয়। এজিদ হাসান অনুজ হোসেনকেও ধ্বংস করতে উদ্যত হয় এবং অবশেষে কারবালা প্রান্তরের এক অসম যুদ্ধে অপ্রস্তুত হোসেন নৃশংসভাবে নিহত হন।
‘উদ্ধার পর্বে’র কাহিনী অংশ শেষ হয়েছে বিপন্ন ইমাম হোসেন এর পরিবারের অস্তিত্বরক্ষা এবং ক্রোধান্ধ দুর্জয় বীর মোহাম্মদ হানিফার প্রতিশোধপরায়ণ কাহিনি বিবরণের মধ্য দিয়ে।
মুসলমানদের বিষাদভরা ঐতিহাসিক কারবালার মর্মান্তিক ঘটনাকে কেন্দ্র করে বাংলা সাহিত্যে মধ্যযুগ থেকেই কাব্য-কবিতা রচনার প্রয়াস লক্ষ করা যায়। কারবালার করুণ কাহিনী নিয়ে গড়ে উঠেছে মর্সিয়া সাহিত্যের বিশাল এক ভাণ্ডার। আধুনিককালেও এই ধারা নিঃশেষিত হয়ে যায়নি। কারবালার ট্র্যাজেডি মাইকেল মধুসূদন দত্তকে (১৮২৪-১৮৭৩) স্পর্শ করেছিল। মহররমের কাহিনী নিয়ে একটি মহৎ মহাকাব্য রচিত হতে পারে বলে তিনি মত পোষণ করেছিলেন।
‘বিষাদ-সিন্ধু’র ‘মুখবন্ধে’ ‘মহরমপর্Ÿে’ লেখক বিষাদ সিন্ধুর কাহিনীর উৎস সম্পর্কে জানিয়েছেন; ‘পারস্য ও আরব্য গ্রন্থ হইতে মূল ঘটনার সারাংশ লইয়া ‘বিষাদ-সিন্ধু’ বিরচিত হইল। প্রাচীন কাব্যগ্রন্থের অবিকল অনুবাদ করিয়া প্রাচীন কবিগণের রচনাকৌশল এবং শাস্ত্রের মর্যাদা রক্ষা করা অত্যন্ত দুরূহ।….তবে মহররমের মূল ঘটনাটি বঙ্গভাষাপ্রিয় প্রিয় পাঠক-পাঠিকাগণের সহজে হৃদয়ঙ্গম করিয়া দেওয়াই আমার একমাত্র মুখ্য উদ্দেশ্য।’ পুঁথির জগৎ থেকে মীর মশাররফ ‘বিষাদ-সিন্ধু’র কাহিনী চয়ন করলেও এই উপাখ্যানে তিনি যে শিল্পবোধের স্বাক্ষর রেখেছেন তা বিশেষ উল্লেখযোগ্য। সমালোচকগণ বলেন, আয়তন ও স্বভাবে মহাকাব্যিক লক্ষণাক্রান্ত এই রচনার প্রধান বৈশিষ্ট্য এর ভাষাসম্পদ। মশাররফের ভাষা-বৈশিষ্ট্যের সর্বাধিক সিদ্ধি ও সাফল্যের পরিচয় পাওয়া যায় এই বইতে। সামগ্রিক বিচারে ‘বিষাদ-সিন্ধু’ই যে মীরের শ্রেষ্ঠ গদ্য নিদর্শন, এই কথায় বোধকরি কারো কোনো দ্বিমত হবে না।
‘বিষাদ-সিন্ধু’র শেষখণ্ড ‘এজিদবধ পর্Ÿে’ হানিফার এজিদ হত্যার ঐকান্তিক প্রচেষ্টা, এজিদের ভূ-গর্ভস্থ গুপ্তকক্ষে পলায়ন ও জ্বলন্ত অগ্নিকুণ্ডে নারকীয় কষ্টভোগ, দৈবনির্দেশে বহু প্রাণক্ষয়কারী হানিফার প্রাকৃতিক বন্দিত্ব এবং হোসেন এর বংশধর জয়নাল আবেদীনের রাজ্যলাভের কাহিনী বিবৃত হয়েছে। উপসংহারে লেখক সত্যের জয় ও পাপের পরিণামফল ভোগের অবশ্যম্ভাবিতার কথা স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন আমাদেরকে।
ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর মহাশয়ের ‘সীতার বনবাস’ বাংলাদেশের ঘরে ঘরে যেমন এককালে পাঠ করা হয়েছিল, ‘বিষাদ-সিন্ধু’ তেমনই আজ পর্যন্ত জাতীয় মহাকাব্যরূপে বাঙালী মুসলমানের ঘরে ঘরে পাঠ করা হয়। বাংলা-সাহিত্যের অপূর্ব সাহিত্য সম্পদ হিসাবে সকল সমাজেই এই গদ্যকাব্যখানির সমান কদর। তাঁহার সাহিত্য প্রতিভা এমনই উচ্চশ্রেণীর ছিল যে, সুদূর অতীতের কারবালা প্রান্তরের ট্র্যাজেডিকে তিনি সমগ্র বাংলাভাষীর ট্র্যাজিডিতে পরিণত করেছেন।’
‘বিষাদ-সিন্ধু’র ভাষায় আবেগ আছে, চিত্রধর্মিতা, নাটকীয়তা আছে, আছে গীতিময়তা ও গতিশীলতা। এজিদের প্রেমতৃষ্ণা, অন্তর্জ্বালা, আবেগ, অস্থিরতা ও মনোদ্বন্দ্ব প্রকাশে এই ভাষার বৈশিষ্ট্য উল্লেখযোগ্য। যেমন- রূপজ মোহে আচ্ছন্ন বিভ্রান্ত-বিক্ষত এজিদের ট্র্যাজিক-উপলব্ধির প্রকাশ; ‘প্রথম কথাতেই জয়নাবের মনের ভাব এজিদ অনেক জানিতে পারিয়াছেন, তাঁহার হস্তে সুতীক্ষ্ম ছুরিকাও দেখিয়াছেন, সে অস্ত্র এজিদের বক্ষে বসিবে না; যাঁহার অস্ত্র, তাঁহারই বক্ষ, তাঁহারই শোণিত,— কিন্তু বিনা আঘাতে, বিনা রক্তপাতে, নিজ হৃদয়ের রক্ত যে আজীবন শরীরের প্রতি লোমকূপ হইতে অদৃশ্যভাবে ঝরিতে থাকিবে, তাহাও এজিদ বুঝিয়াছিলেন।’ [উদ্ধার পর্ব্ব, একবিংশ প্রবাহ]। জয়নাব-প্রত্যাখ্যাত এজিদের অতৃপ্ত প্রেমাকাঙ্ক্ষা ও আহত পৌরুষ যখন বিক্ষুব্ধ অভিমানে চঞ্চল হয়ে ওঠে তখন একজন প্রেম-ভিক্ষু বিপর্যস্ত মানুষের প্রতিকৃতি পাঠকের সম্মুখে উদ্ভাসিত হয়।
‘বিষাদ-সিন্ধু’ উপন্যাসের চরিত্র-চিত্রণে মশাররফ হোসেনের সাফল্য ও সীমাবদ্ধতা সম্পর্কে কাজী আবদুল ওদুদ যে সংক্ষিপ্ত অথচ প্রাসঙ্গিক আলোচনা করেছেন তা গুরুত্বপূর্ণ। তাঁর বিবেচনায়, মশাররফের সৃষ্ট চরিত্রসমূহ পূর্ণাবয়ব লাভ করতে পারেনি মূলত তাঁর কবিসুলভ আবেগ উচ্ছ্বাসের কারণে। প্রচলিত ধর্ম ও মানবাদর্শের অনুশীলন যাঁদের চরিত্রে সর্বাধিক, তাঁরা রক্তমাংসের মানুষ হিসেবে প্রতিষ্ঠা না পেয়ে হয়ে উঠেছে ‘ধর্মাচারের সমষ্টি মাত্র’। তবে এর বাইরে একমাত্র সীমার ব্যতীত অন্যান্য চরিত্র ‘স্বাভাবিক মানুষ’ হিসেবেই আবির্ভূত হয়েছে, কেউই নিরঙ্কুশ ‘অমানুষ’ বা ‘শয়তান’ হিসেবে চিত্রিত হয়নি। ‘‘প্রচণ্ড প্রতাপে, নিষ্ঠুর নির্যাতনে, ঈর্ষা-হিংসা, কূট-ষড়যন্ত্রণা ও প্রবঞ্চনা প্রবণতায়’ এজিদ যে মহাভারতের দুর্যোধনের সমগোত্রীয়, সে ধারণাও কেউ কেউ পোষণ করেছেন।’’ – হাসান আজিজুল হক
এজিদ কেবল ‘বিষাদ-সিন্ধু’র কেন্দ্রীয় চরিত্রই নয়, কাহিনীর নিয়ন্ত্রকশক্তিও সে। হাসান-হোসেন বা কারবালার কাহিনী এই উপন্যাসে উপলক্ষ্য মাত্র, মূল লক্ষ্য এজিদ, তার প্রেমতৃষ্ণার ভয়াবহ পরিণাম-নির্দেশ। তাই ‘শিল্পী মশাররফ এজিদ-চরিত্র রূপায়ণেই তাঁর শ্রেষ্ঠ মনোযোগ অর্পণ করেছিলেন।’- আবু হেনা মোস্তফা কামাল
“নিয়তি-নির্ধারিত এক মানবভাগ্যের করুণ পরিণতি নেমে এসেছে এজিদের জীবনে। প্রণয়-বঞ্চিত আত্মদ্বন্দ্বে পরাভূত এক বিক্ষত মানুষের করুণ মর্মস্পর্শী কাহিনী হয়ে উঠেছে ‘বিষাদ-সিন্ধু’। যথার্থই, ‘ইতিহাসের প্রকৃত মরুপ্রান্তর নয়, এজিদের প্রেমদীর্ণ হৃদয়ই এখানে কারবালায় রূপান্তরিত হয়েছে। বিষাদের উত্তাল তরঙ্গসমূহের উৎস এজিদের হৃদয়-সিন্ধু।’’- মুনীর চৌধুরী
নারীচরিত্রের মধ্যে জয়নাব, সখিনা, জাএদা ও মায়মুনা উল্লেখযোগ্য। এক অর্থে, ‘বিষাদ-সিন্ধু’র কাহিনী অনুসারে জয়নাবই এই বিনাশী সমর-সংঘাতের মূল কারণ। তার সঙ্গে ক্লাসিক সাহিত্য ‘ইলিয়াড’ এর হেলেনের তুলনা চলে আসে। সামগ্রিক বিচারে জয়নাবই ‘বিষাদ-সিন্ধু’র নায়িকা। তার অন্তর্দহন ও ট্র্যাজেডিও গভীর। এই চরিত্রটির পরিকল্পনাতেও ‘মেঘনাদবধ কাব্যে’র সীতা-চরিত্রের সাদৃশ্য আছে প্রতীয়মান হয়। সমালোচকের সাক্ষ্য; ‘মেঘনাদবধে’র সীতা-চরিত্রের মাধুর্য ও কোমলতার অনেকখানি সমাবেশ ঘটেছে ‘বিষাদ-সিন্ধু’র জয়নাব চরিত্রটিতে। গ্রন্থের শেষের দিক জয়নাবের যে দীর্ঘ আত্মবিলাপ রয়েছে তার সঙ্গে সীতা ও সরমার কথোপকথনের সাদৃশ্য সহজেই চোখে পড়ে।’- (কাজী আবদুল ওদুদ)। তবে হাসান-হোসেন যেমন এজিদ-চরিত্রের পাশাপাশি অনুজ্জ্বল, তেমনি জয়নাবও জাএদার কাছে নিষ্প্রভ।
জাএদা ‘বিষাদ-সিন্ধু’ উপাখ্যানের সবচেয়ে প্রাণবন্ত নারী-চরিত্র। জাএদা স্বভাবে-আচরণে অনেকটাই এজিদের সমধর্মা। সে এজিদের মতোই প্রেমের দাবি পূরণ করতে গিয়ে নির্মম-নিষ্ঠুর-অমানবিক হতে বিন্দুমাত্র দ্বিধাবোধ করে না। সামান্যতম হলেও, এজিদের অনুশোচনাবোধ আছে কিন্তু জাএদা চরিত্রে তার লেশটুকুও মেলে না। এ-কথা মানতেই হয়, জাএদা চরিত্রে ‘প্রেমিক নারীর ঈর্ষা এবং সপত্নীদ্বেষের তীব্র রূপ’ প্রকাশিত হয়েছে এবং তা ‘একটি অসাধারণ নারীচরিত্রের মনস্তাত্ত্বিক বিকারের ছবি’। ‘জাএদা বাঁচিয়া থাকিতে স্বামী ভাগ করিয়া লইবে না।’ – মহরম পর্ব, ত্রয়োদশ প্রবাহ
এই উপলব্ধি থেকেই জাএদার মনে প্রতিহিংসা জাগ্রত হয়েছে, জন্ম নিয়েছে ঈর্ষা। মায়মুনার সঙ্গে আলাপচারিতায় তার অন্তরের গভীর বেদনা প্রকাশিত হয়েছে : ‘যে আমার হইল না, আমার মুখের দিকে যে ফিরিয়া তাকাইল না, আমার মুখের দিকে যে ফিরিয়া তাকাইল না, তাহাকে ঔষধে বশ করিয়া লাভ কি বোন!’ – মহরম পর্ব, ত্রয়োদশ প্রবাহ
প্রণয়ে কেউ বশীভূত না হলে জোর করে বশ করা যায় কি? প্রণয়ে কেউ আসক্ত হলে রাজ্যের বিনিময়ে তাকে ফেরানো সম্ভব কি? যে মানুষ প্রলোভনে পড়ে ঘরে মানুষকে হত্যা করতে চেষ্টা করতে পারে সে মানুষ পরকে নৃশংসভাবে আঘাত করবে না এই নিশ্চয়তা কে দিবে। সে বোধ থেকেই এজদি হয়ত জাএদাকে শাস্তি দিয়েছে ‘সিরাজদ্দৌলা’ নাটকে যেমন ক্লাইভ বলেছিল, ‘আমি বরং ক্লাইভকে বিশ্বাস করতে পারি মীর জাফরকে নয়।’

Advertisement

ক্রমশ…

লেখক:  সহকারী অধ্যাপক, বাংলা
৩৪তম বিসিএস (সাধারণ শিক্ষা)
সরকারি আশেক মাহমুদ কলেজ, জামালপুর

 

Advertisement