Skip to content
প্রকাশ- November 2, 2026 , 15:10 pm
ফিচার

রমিজলের স্বপ্ন

রমিজলের স্বপ্ন

মোহাম্মদ আলী।

রমিজল মিয়ার সংসারে অভাব যেন নিত্যসঙ্গী। পাঁচ সন্তান, স্ত্রী আর নিজে—সাত জনের মুখে দুবেলা ভাত তুলে দেওয়াই তার কাছে যুদ্ধের মতো। অন্যের জমিতে দিনমজুরি করে যা পান, তা দিয়ে চাল কিনতে কিনতেই মাস ফুরিয়ে যায়। মহাজনের ঋণের বোঝা প্রতিদিন একটু একটু করে বাড়ে। বড় ছেলে কালাম তখন বারো বছরের। ছেলেটার চোখে কৌতূহল, মুখে দুষ্টুমি ভরা হাসি, আর বাবার কষ্ট দেখে তার মনে একটা চাপা কষ্টও জমে থাকত।
একদিন বিকেলে রমিজলের দূর সম্পর্কের চাচাতো ভাইয়ের সাথে শফিক নামে একটি লোক তাদের বাড়িতে বেড়াতে আসে। শহুরে পোশাক, হাতে ঘড়ি, মুখে মিষ্টি কথা। “ভাইজান, ঢাকায় আমার পরিচিত একটা কারখানা আছে। কালামরে পাঠায়া দেন, মাসে মাসে টাকা পাঠাইবো। ছেলেডা মানুষ হইবো, আপনাগো কষ্টও কমবো।”
রমিজলের বুকের ভেতর তখন এক অদ্ভুত আলো জ্বলে উঠল। স্ত্রীর সাথে কথা বললেন, রাত জেগে ভাবলেন। কালামের মা চোখের পানি মুছে বললেন, “ছেলেডারে আল্লাহর হাতে ছাইড়া দেই। হয়তো ওর কপালে ভালো কিছু আছে।”
যাওয়ার দিন কালাম মায়ের আঁচল ধরে কাঁদল। বাবা মাথায় হাত বুলিয়ে বললেন, “বাবা, কষ্ট কইরো না। টাকা পাঠাইস, তোর ছোট ভাইবোনগুলারে স্কুলে দিমু।” কালাম মাথা নেড়ে বাসে উঠল। সেই শেষবার সে নিজের পায়ে হেঁটে কোথাও গিয়েছিল।
ঢাকায় পৌঁছেই শফিক তাকে এক অপরিচিত লোকের হাতে তুলে দিল। তারপর শুরু হলো দুঃস্বপ্নের যাত্রা। কালামকে নিয়ে যাওয়া হলো শহরের বাইরে এক জনমানবহীন জায়গায়। সেখানে কয়েকজন নিষ্ঠুর মানুষ তাকে আটকে রাখল। কালাম বুঝতেই পারল না কী হতে চলেছে, যতক্ষণ না তার ডান হাত আর বাঁ পায়ে ধারালো কিছু একটা নেমে এলো। যন্ত্রণায় সে চিৎকার করে জ্ঞান হারাল। যখন চোখ খুলল, নিজের শরীরের দিকে তাকিয়ে চিনতেই পারল না নিজেকে। তার হাত নেই, পা নেই—আছে শুধু ব্যান্ডেজ-জড়ানো ক্ষত আর অসহ্য যন্ত্রণা।
কয়েকদিন পর তাকে বসিয়ে দেওয়া হলো শহরের এক ব্যস্ত মোড়ে, রাস্তার পাশে ছেঁড়া কাপড়ের ওপর। তাকে শেখানো হলো কীভাবে করুণ চোখে মানুষের দিকে তাকাতে হয়, কীভাবে হাত পেতে ভিক্ষা চাইতে হয়। যে সামান্য টাকা মানুষ দয়া করে দিত, তা সন্ধ্যায় এসে এক কঠোর লোক নিয়ে যেত। বিনিময়ে কালাম পেত শুধু দুবেলা শুকনো খাবার, আর রাতে এক ভাঙা গুদামঘরে মাথা গোঁজার ঠাঁই।
প্রতিদিন রাস্তায় বসে কালাম দূর আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকত। তার মনে পড়ত মায়ের হাতের রান্নার গন্ধ, বাবার ক্লান্ত কিন্তু স্নেহভরা মুখ, ছোট ভাইবোনদের হাসি। সে ভাবত—”বাবা নিশ্চয়ই ভাবছে আমি ভালো আছি, কাজ করছি, টাকা পাঠাবো।” কিন্তু সে জানত না কীভাবে বাবাকে খবর দেবে। তার মুখে ভাষা ছিল, কিন্তু বলার সুযোগ ছিল না। তার হাত ছিল না চিঠি লেখার, পা ছিল না পালানোর।
এদিকে রমিজল মিয়া প্রতিদিন গ্রামের পোস্ট অফিসে যেতেন, কোনো টাকা এসেছে কিনা খোঁজ নিতে। মাসের পর মাস কোনো খবর নেই। শফিকের মোবাইল নম্বরও বন্ধ পাওয়া যেত। রমিজলের স্ত্রী রাতে ছেলের জন্য কাঁদতেন, রমিজল সান্ত্বনা দিতেন—”আল্লাহ ভরসা, ছেলে ভালো আছে।” কিন্তু তার নিজের বুকের ভেতরও একটা অজানা আশঙ্কা কুরে কুরে খেত।
বছর ঘুরে গেল। রমিজলের স্বপ্ন তখনো অটুট—তার ছেলে একদিন ফিরে আসবে, হাতে টাকা নিয়ে, মুখে হাসি নিয়ে। অথচ সেই মুহূর্তে শহরের কোনো এক ফুটপাতে, ধুলোমাখা রাস্তায়, এক পঙ্গু কিশোর হাত পেতে বসে আছে, যার চোখে এখন আর কান্নাও আসে না—শুধু একরাশ শূন্যতা।

Advertisement

প্রভাষক, ইংরেজি বিভাগ, ড. আব্দুল মজিদ তালুকদার ডিগ্রি কলেজ, জামালপুর
muhammedalieng@gmail.com

Advertisement