Skip to content
প্রকাশ- November 2, 2026 , 15:10 pm
ফিচার

সনদ আছে, কিন্তু জীবনের পাঠ কোথায়?

সনদ আছে, কিন্তু জীবনের পাঠ কোথায়?

শিশুটি যখন প্রথম স্কুলের গেট পেরিয়ে ভেতরে প্রবেশ করে, তার কাঁধে থাকে একটি ছোট্ট ব্যাগ, আর বাবা-মায়ের চোখে থাকে বিশাল এক স্বপ্ন। সেই স্বপ্নের নাম, “আমার সন্তান মানুষ হবে।”

তারপর শুরু হয় দীর্ঘ এক যাত্রা। বই, খাতা, ক্লাস, পরীক্ষা, কোচিং, প্রতিযোগিতা, নম্বর, জিপিএ, সিজিপিএ। বছরের পর বছর সে শেখে কীভাবে পরীক্ষায় ভালো করতে হয়। ভুল করলে নম্বর কাটা যায়, ঠিক উত্তর দিলে প্রশংসা মেলে।

Advertisement

কিন্তু কেউ কি তাকে শেখায়, জীবনের ভুলগুলো থেকে কীভাবে শিক্ষা নিতে হয়?

কেউ কি শেখায়, প্রথম বেতন হাতে পাওয়ার পর কীভাবে সেই অর্থের সঠিক ব্যবহার করতে হয়?

কেউ কি শেখায়, অল্প আয় থেকেও কীভাবে সঞ্চয়ের অভ্যাস গড়ে তুলতে হয়?

কেউ কি শেখায়, একটি দক্ষতাই একদিন হাজারো সুযোগের দরজা খুলে দিতে পারে?

দুঃখজনক হলেও সত্য, আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থায় এসব প্রশ্নের উত্তর খুব কমই পাওয়া যায়।

আমরা এমন এক সমাজ গড়েছি, যেখানে সনদকে সাফল্যের একমাত্র মাপকাঠি বানিয়ে ফেলেছি। ফলে শিক্ষার্থীদের কাছে শিক্ষার অর্থ হয়ে দাঁড়িয়েছে পরীক্ষায় ভালো ফল করা এবং কোনো একটি চাকরি পাওয়া। অথচ জীবন শুধু চাকরির নাম নয়, জীবন হলো সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা, আত্মনির্ভরশীলতা, দায়িত্ববোধ এবং প্রতিনিয়ত নিজেকে গড়ে তোলার এক নিরন্তর সংগ্রাম।

আজ একজন তরুণ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বেরিয়ে অনেক সময় বুঝতে পারে, সে পদার্থবিজ্ঞানের সূত্র জানে, কিন্তু নিজের অর্থনৈতিক ভবিষ্যতের কোনো পরিকল্পনা জানে না। সে জটিল অঙ্ক সমাধান করতে পারে, কিন্তু নিজের আয়-ব্যয়ের হিসাব ঠিকভাবে সাজাতে পারে না। সে বিশ্ব ইতিহাস মুখস্থ বলতে পারে, কিন্তু নিজের স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার পথ খুঁজে পায় না।

এ ব্যর্থতা শুধু একজন তরুণের নয়। এটি আমাদের শিক্ষা দর্শনেরও একটি সীমাবদ্ধতা।

পৃথিবী বদলে গেছে। আজ জ্ঞান শুধু বইয়ের পাতায় সীমাবদ্ধ নয়। প্রযুক্তি বদলে দিয়েছে কাজের ধরন, অর্থনীতির কাঠামো এবং সফলতার সংজ্ঞা। এখন একটি দক্ষতা, একটি নতুন ধারণা কিংবা একটি ছোট উদ্যোগও একজন মানুষকে আত্মনির্ভরশীল করে তুলতে পারে। কিন্তু সেই প্রস্তুতি যদি শিক্ষাজীবনেই না আসে, তাহলে সনদ হাতে নিয়েও অনেকেই অনিশ্চয়তার অন্ধকারে পথ হারায়।

কল্পনা করুন, যদি প্রতিটি শিক্ষার্থী ছোটবেলা থেকেই শিখত কীভাবে সৎ উপায়ে অর্থ উপার্জন করতে হয়, কীভাবে বাজেট তৈরি করতে হয়, কীভাবে সঞ্চয় ও বিনিয়োগের মৌলিক ধারণা কাজে লাগাতে হয়, কীভাবে ব্যর্থতাকে নতুন শুরুর শক্তিতে পরিণত করতে হয়, কিংবা কীভাবে নিজের দক্ষতাকে উদ্যোক্তায় রূপ দেওয়া যায়, তাহলে হয়তো আমাদের সমাজে বেকারত্বের চিত্রও ভিন্ন হতো।

অবশ্যই শিক্ষা কেবল অর্থ উপার্জনের জন্য নয়। শিক্ষা মানুষকে নৈতিকতা, মানবিকতা, সত্যবাদিতা এবং সামাজিক দায়িত্বও শেখায়। কিন্তু সেই শিক্ষার সঙ্গে যদি বাস্তব জীবনের আর্থিক সচেতনতা ও কর্মদক্ষতার সমন্বয় না ঘটে, তবে শিক্ষার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ অপূর্ণ থেকে যায়।

আমাদের দরকার এমন একটি শিক্ষা ব্যবস্থা, যেখানে একজন শিক্ষার্থী শুধু চাকরির পরীক্ষার জন্য নয়, জীবনের পরীক্ষার জন্যও প্রস্তুত হবে। যেখানে সনদের পাশাপাশি গড়ে উঠবে চরিত্র, দক্ষতা, আত্মবিশ্বাস এবং উদ্যোগী মানসিকতা। যেখানে একজন তরুণ শুধু নিজের জন্য চাকরি খুঁজবে না, অন্যের জন্যও কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করার স্বপ্ন দেখবে।

একটি জাতির উন্নতি শুধু উচ্চশিক্ষিত মানুষের সংখ্যায় নয়, বরং তাদের সৃজনশীলতা, উদ্ভাবনী শক্তি, আর্থিক সচেতনতা এবং আত্মনির্ভরশীলতার ওপর নির্ভর করে।

তাই সময় এসেছে শিক্ষা ব্যবস্থাকে নতুনভাবে ভাবার। এমন শিক্ষা চাই, যা মানুষকে শুধু পরীক্ষায় পাস করায় না, জীবনের কঠিন বাস্তবতায়ও মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে শেখায়। এমন শিক্ষা চাই, যা শুধু সনদ দেয় না, সাহস দেয়। শুধু মুখস্থ করায় না, চিন্তা করতে শেখায়। শুধু চাকরি খুঁজতে নয়, স্বপ্ন গড়তে শেখায়।

কারণ, একটি সনদ হয়তো চাকরির দরজা খুলে দিতে পারে। কিন্তু একটি দক্ষতা, সৎ মূল্যবোধ এবং আর্থিক প্রজ্ঞাই একজন মানুষকে সারাজীবন সম্মানের সঙ্গে বাঁচার শক্তি দেয়।

যেদিন আমাদের শিক্ষা মানুষকে শুধু “কী ভাবতে হবে” নয়, “কীভাবে ভাবতে হবে” এবং “কীভাবে জীবন গড়তে হবে” সেটিও শেখাবে, সেদিনই শিক্ষা সত্যিকার অর্থে পূর্ণতা পাবে।

– আব্দুর রহিম খান, সাংবাদিক ও লেখক

Advertisement