একটি সরকার পরিবর্তন আর একটি রাষ্ট্রের পরিবর্তন এক কথা নয়। সরকার আসে, সরকার যায়; কিন্তু রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠান, প্রশাসনিক সংস্কৃতি, অর্থনৈতিক কাঠামো ও রাজনৈতিক আচরণ যদি একই থাকে, তাহলে জনগণের জীবনে কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন আসে না। বাংলাদেশের অভিজ্ঞতাও দেখিয়েছে, প্রবৃদ্ধি ও অবকাঠামোগত উন্নয়ন গুরুত্বপূর্ণ হলেও তা একা মানুষের মুক্তি নিশ্চিত করতে পারে না। বিশ্বব্যাংকের হিসাবে, ২০২২ সালে দেশের জাতীয় দারিদ্র্যের হার ছিল ১৮.৭ শতাংশ, যা ২০২৫ সালে আনুমানিক ২১.৪ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। একই সময়ে উচ্চ মূল্যস্ফীতি মানুষের প্রকৃত আয় ও জীবনযাত্রার ওপর চাপ তৈরি করেছে। দুর্নীতির চিত্রও উদ্বেগজনক। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনালের ২০২৫ সালের দুর্নীতি ধারণা সূচকে বাংলাদেশ ১০০-এর মধ্যে ২৪ পেয়ে ১৮২ দেশের মধ্যে ১৫০তম অবস্থানে রয়েছে। এসব পরিসংখ্যান একটি বিষয় স্পষ্ট করে, রাষ্ট্রের সাফল্য শুধু কতগুলো সেতু, রাস্তা বা ভবন নির্মিত হলো, তা দিয়ে মাপা যায় না; মাপতে হয় সাধারণ মানুষের আয়, নিরাপত্তা, ন্যায়বিচার, সেবাপ্রাপ্তি ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের প্রতি আস্থার মাধ্যমে।
এই বাস্তবতায় প্রয়োজন ক্ষমতার পালাবদলের চেয়ে বড় একটি রাজনৈতিক পরিবর্তন, আর সেটিই হতে পারে মানবতার রাজনীতির অভ্যুত্থান। মানবতার রাজনীতি কোনো আবেগনির্ভর ধারণা নয়; এর ভিত্তি হলো মানুষের মর্যাদা, আইনের সমতা, নাগরিক স্বাধীনতা, অর্থনৈতিক ন্যায় এবং রাষ্ট্রীয় জবাবদিহি। রাষ্ট্রের কাছে নাগরিকের পরিচয় হবে তার অধিকার, দলীয় আনুগত্য নয়। বিরোধী মতকে দমন করা নয়, তার অধিকার রক্ষা করাই হবে গণতন্ত্রের পরীক্ষা। ক্ষমতায় থাকা দল যেমন জবাবদিহির বাইরে থাকবে না, বিরোধী দলও তেমনি দায়িত্বহীনতার সুযোগ পাবে না। কারণ রাষ্ট্র কোনো দল বা ব্যক্তির সম্পত্তি নয়; রাষ্ট্র নাগরিকের সম্মিলিত প্রতিষ্ঠান।
মানবিক রাষ্ট্র গড়তে হলে দুর্নীতির বিরুদ্ধে প্রচারণার পাশাপাশি দুর্নীতির সুযোগ কমাতে হবে। সরকারি অর্থ ব্যয়ের স্বচ্ছতা, সম্পদের হিসাব, ডিজিটাল ও সহজ প্রশাসনিক সেবা, স্বাধীন তদন্ত এবং দ্রুত বিচার নিশ্চিত করতে হবে। শিক্ষা ও স্বাস্থ্যকে রাজনৈতিক অনুগ্রহ নয়, নাগরিক অধিকার হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে হবে। কৃষককে ন্যায্য বাজার, শ্রমিককে নিরাপদ কর্মপরিবেশ, তরুণকে দক্ষতা ও কর্মসংস্থানের সুযোগ এবং ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাকে সহজ অর্থায়ন দিতে হবে। সামাজিক নিরাপত্তার অর্থ প্রকৃত দরিদ্রের কাছে পৌঁছাতে হবে। বিশ্বব্যাংকের মূল্যায়নেও বাংলাদেশের সামাজিক সহায়তা ব্যবস্থায় লক্ষ্যভিত্তিক সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা উঠে এসেছে। একই সঙ্গে স্থানীয় সরকারকে বাস্তব ক্ষমতা, অর্থ ও জনবল না দিলে জনগণের অংশগ্রহণমূলক রাষ্ট্র গঠন সম্ভব নয়। ইউনিয়ন, পৌরসভা ও উপজেলা পর্যায়ে বাজেট, প্রকল্প ও ব্যয়ের হিসাব জনগণের সামনে প্রকাশ করা এবং নিয়মিত জনশুনানির ব্যবস্থা করা যেতে পারে জবাবদিহির কার্যকর ভিত্তি।
এই পরিবর্তনের জন্য বড় বড় স্লোগানের চেয়ে প্রয়োজন পরিমাপযোগ্য কর্মসূচি। প্রথম একশ দিনে জনশুনানি ও স্থানীয় সমস্যার তথ্যভিত্তিক তালিকা তৈরি করা যেতে পারে। প্রথম বছরে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কৃষি, কর্মসংস্থান, বিচার, দুর্নীতি ও স্থানীয় সরকার নিয়ে সময়সীমাবদ্ধ নীতি গ্রহণ করতে হবে। পাঁচ বছরের লক্ষ্য হতে পারে প্রতিষ্ঠান শক্তিশালী করা, বিচার ও প্রশাসনে নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করা, সরকারি ব্যয়ের স্বচ্ছতা বাড়ানো এবং নাগরিক সেবার মান উন্নত করা। প্রতিটি প্রতিশ্রুতির সঙ্গে থাকতে হবে সময়সীমা, দায়িত্বশীল প্রতিষ্ঠান এবং জনগণের কাছে অগ্রগতি প্রকাশের বাধ্যবাধকতা।
মানবতার রাজনীতির মূল কথা তাই সরকার বদল নয়, রাষ্ট্রের চরিত্র বদল। নতুন মুখ দিয়ে পুরোনো ব্যবস্থা টিকিয়ে রাখা কোনো বিপ্লব নয়। বিপ্লব তখনই অর্থবহ হবে, যখন রাষ্ট্রের কেন্দ্রে ক্ষমতার পরিবর্তে মানুষ স্থান পাবে, প্রতিষ্ঠান ব্যক্তির ঊর্ধ্বে উঠবে, আইন পরিচয়ের ঊর্ধ্বে থাকবে এবং উন্নয়নের সুফল সমাজের বৃহত্তর অংশের কাছে পৌঁছাবে। সেই পরিবর্তন হঠকারী সংঘাতের মাধ্যমে নয়, মানুষের চিন্তা, রাজনৈতিক সংস্কৃতি, প্রতিষ্ঠান ও রাষ্ট্র পরিচালনার পদ্ধতিতে ধারাবাহিক পরিবর্তনের মাধ্যমে ঘটাতে হবে। মুক্তির একটাই পথ: মানবতার রাজনীতির অভ্যুত্থান। আর সেই অভ্যুত্থানের চূড়ান্ত লক্ষ্য হবে এমন একটি মানবিক রাষ্ট্র, যেখানে ক্ষমতা জনগণের আমানত, আইন সবার জন্য সমান এবং মানুষের মর্যাদাই রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ মূল্য।
– আব্দুর রহিম খান, লেখক ও সাংবাদিক
