Skip to content
প্রকাশ- November 2, 2026 , 13:35 pm
মুক্তমত

একটি ছবি, একটি খালি চেয়ার—কূটনীতির নীরব বার্তা

একটি ছবি, একটি খালি চেয়ার—কূটনীতির নীরব বার্তা

আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে সব প্রতিবাদ শব্দ করে আসে না। কখনো একটি খালি চেয়ার, একটি ছবি কিংবা একটি নীরব প্রস্থানও অনেক বড় বার্তা হয়ে উঠতে পারে। নিউইয়র্কে জাতিসংঘের ৮১তম সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে বৃহস্পতিবার এমনই একটি দৃশ্য তৈরি হলো।

ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু যখন বক্তব্য দেওয়ার জন্য জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের মঞ্চে উঠলেন, তখন ইরানের প্রতিনিধিরা সভাকক্ষ থেকে বেরিয়ে যান। কিন্তু তারা চলে যাওয়ার আগে নিজেদের নির্ধারিত আসনের টেবিলে রেখে যান প্রয়াত ইরানি কমান্ডার কাসেম সোলায়মানির একটি প্রতিকৃতি। ঘটনাটি রয়টার্সসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের ক্যামেরায় ধরা পড়ে।

Advertisement

এখানেই ঘটনাটির রাজনৈতিক তাৎপর্য।
ইরানি প্রতিনিধিদের পক্ষ থেকে কোনো দীর্ঘ বক্তব্য ছিল না, মঞ্চে উঠে কোনো স্লোগানও দেওয়া হয়নি। তারা শুধু চলে গেলেন—আর রেখে গেলেন একটি ছবি। এরপর সেই ছবিই হয়ে উঠল দৃশ্যটির সবচেয়ে শক্তিশালী অংশ।

ভাবুন, নেতানিয়াহু দাঁড়িয়ে বক্তব্য দিচ্ছেন। সামনে জাতিসংঘের বিশাল সভাকক্ষ। আর যেখানে ইরানের প্রতিনিধিরা বসার কথা, সেখানে কোনো প্রতিনিধি নেই—আছে শুধু সোলায়মানির প্রতিকৃতি। ক্যামেরা যখন সেই খালি আসনের দিকে ফিরে যায়, তখন অনুপস্থিত প্রতিনিধিরাও যেন দৃশ্যের ভেতর উপস্থিত হয়ে ওঠেন।

রাজনীতিতে প্রতীকের শক্তি এখানেই। একটি প্রতীক কখনো দীর্ঘ বক্তৃতার চেয়েও বেশি সময় মানুষের মনে থাকে।
কাসেম সোলায়মানি ইরানের সামরিক ও রাজনৈতিক পরিসরে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং একই সঙ্গে বিতর্কিত একটি চরিত্র। ২০২০ সালে ইরাকের বাগদাদে মার্কিন ড্রোন হামলায় তিনি নিহত হন। ইরানের কাছে তিনি গুরুত্বপূর্ণ সামরিক ব্যক্তিত্ব ও প্রতিরোধের প্রতীক; অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের কাছে তিনি ছিলেন আঞ্চলিক সামরিক কর্মকাণ্ডের গুরুত্বপূর্ণ কমান্ডার। তাই তার একটি ছবি জাতিসংঘের মতো কূটনৈতিক মঞ্চে রেখে যাওয়া নিছক একটি ব্যক্তিগত স্মৃতিচিহ্ন হিসেবে দেখার সুযোগ কম।

এখানে আরও একটি বিষয় লক্ষ করার মতো—এই দৃশ্য তৈরি করতে ইরানের প্রতিনিধিদের খুব বেশি কিছু করতে হয়নি। তারা কোনো সংঘাতে যায়নি, কাউকে বাধা দেয়নি, বক্তব্যের মাঝখানে হৈচৈ করেনি। শুধু নিজেদের অবস্থান প্রকাশ করে সরে গেছে। তারপর ক্যামেরা, সংবাদমাধ্যম এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম সেই দৃশ্যকে বহুগুণে ছড়িয়ে দিয়েছে।
অবশ্য এই ঘটনাকে ইরানের পক্ষ থেকে পরিকল্পিত ‘মাইন্ড গেম’ হিসেবে দেখা হবে কি না, সেটি ব্যাখ্যার বিষয়। কিন্তু প্রতীকী প্রতিবাদের দিক থেকে এর প্রভাব অস্বীকার করা কঠিন। একই অধিবেশনে নেতানিয়াহুর বক্তব্যের সময় বহু দেশের প্রতিনিধিদলও সভাকক্ষ ত্যাগ করে; ফলে ওয়াকআউটটি একক কোনো ঘটনার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না।

আন্তর্জাতিক কূটনীতির সৌন্দর্য ও জটিলতা এখানেই—এখানে প্রতিটি শব্দের যেমন অর্থ আছে, তেমনি নীরবতারও অর্থ আছে। কখনো একটি বক্তব্য রাষ্ট্রের অবস্থান জানায়, আবার কখনো একটি খালি চেয়ার জানিয়ে দেয় সেই বক্তব্যের প্রতি কারও অবস্থান কী।

জাতিসংঘের সেই সভাকক্ষে সোলায়মানির ছবিটি তাই হয়তো কেবল একটি ছবি ছিল না। সেটি ছিল একটি প্রতীকী উপস্থিতি—একটি নীরব বার্তা, যার ব্যাখ্যা করার কাজ শেষ পর্যন্ত করে দিয়েছে ক্যামেরা ও বিশ্বমাধ্যম।

লেখক – মো. আবু হানিফ

Advertisement