ইসলাম কেবল কিছু ইবাদতের নাম নয়; এটি একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা। ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ এবং রাষ্ট্রের প্রতিটি স্তরে ন্যায়, সততা, শালীনতা ও নৈতিকতার প্রতিষ্ঠাই ইসলামের অন্যতম লক্ষ্য। তাই যে দল ইসলামের পতাকা বহন করে, মানুষের সামনে ইসলামী মূল্যবোধের কথা বলে এবং সমাজকে নৈতিকতার পথে আহ্বান জানায়, তাদের নেতা-কর্মীদের কাছ থেকে মানুষের প্রত্যাশাও স্বাভাবিকভাবেই অনেক বেশি।
কিন্তু বাস্তবতা হলো, কোনো রাজনৈতিক দলই ফেরেশতাদের নিয়ে গঠিত নয়। মানুষ ভুল করবে, কখনো প্রবৃত্তির কাছে হার মানবে, কখনো পদস্খলন ঘটবে। এটি মানবজাতির চিরন্তন বাস্তবতা। একটি সম্পূর্ণ নিষ্কলুষ সমাজ কেবল কল্পনায় সম্ভব। তাই বিচ্ছিন্ন ব্যক্তিগত অপরাধকে পুরো আদর্শের ব্যর্থতা হিসেবে দেখাও যেমন সঠিক নয়, তেমনি আদর্শের নামে সেই অপরাধকে আড়াল করাও আরও বড় অন্যায়।
বরং ক্ষমতার যত কাছে যাওয়া যায়, পরীক্ষাও তত কঠিন হয়ে ওঠে। দায়িত্ব, প্রভাব ও সুযোগ যত বাড়ে, নৈতিক বিচ্যুতির ঝুঁকিও তত বৃদ্ধি পায়। তাই ইসলামী দলগুলোর উচিত নিজেদের ভেতরে আত্মশুদ্ধি, জবাবদিহি এবং শৃঙ্খলার সংস্কৃতিকে আরও শক্তিশালী করা।
একই সঙ্গে আমাদের নিজেদের দৃষ্টিভঙ্গিও সংশোধন করা প্রয়োজন। আমরা অনেক সময় অন্যের ভুলের বিচার করতে এতটাই ব্যস্ত হয়ে পড়ি যে নিজের দুর্বলতার কথাই ভুলে যাই। অথচ কুরআন ও সুন্নাহ আমাদের শিখিয়েছে, মানুষের সম্মান ও ব্যক্তিগত গোপনীয়তা রক্ষা করা একটি গুরুত্বপূর্ণ ইসলামী শিক্ষা। কারও গোপন ত্রুটি অনুসন্ধান করা, তাকে অপমান করা বা নিজেকে নৈতিকতার একমাত্র মানদণ্ড মনে করা ইসলামের শিক্ষা নয়।
আজ যে মানুষটি ভুল করেছে, কাল সেই পরীক্ষায় আমি পড়ব না, তার নিশ্চয়তা কোথায়? শয়তানের কুমন্ত্রণা, নফসের প্রবৃত্তি এবং দুনিয়ার মোহ থেকে আল্লাহর সাহায্য ছাড়া কেউ নিরাপদ নয়। তাই অন্যের প্রতি আঙুল তোলার আগে নিজের হৃদয়ের দিকে তাকানোই একজন মুমিনের প্রথম দায়িত্ব। পাপকে ঘৃণা করতে হবে, কিন্তু পাপীকে অবজ্ঞা করে নিজেকে নিরাপদ ভাবার কোনো সুযোগ নেই।
অন্যদিকে, দলীয় শৃঙ্খলার প্রশ্নে কোনো আপস চলতে পারে না। ব্যক্তি যত বড় নেতা হোন না কেন, অপরাধ প্রমাণিত হলে তার বিরুদ্ধে নিরপেক্ষ ও দৃশ্যমান ব্যবস্থা নিতে হবে। আদর্শের সবচেয়ে বড় সৌন্দর্য ভুলকে ঢেকে রাখা নয়, বরং সত্যকে স্বীকার করে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করা। যখন সবাই জানবে যে অনৈতিকতার মূল্য দিতে হবে, তখন নৈতিক শৃঙ্খলাও স্বাভাবিকভাবেই শক্তিশালী হবে।
ইসলাম আমাদের শিখিয়েছে, অন্যের দোষ প্রকাশের চেয়ে নিজের আত্মসমালোচনা অধিক কল্যাণকর। তাই সমাজকে বদলাতে চাইলে প্রথমে নিজেকে বদলাতে হবে। নৈতিকতার প্রকৃত বিজয় তখনই হবে, যখন আমরা অন্যের বিচারক হওয়ার আগে নিজের হিসাব নিতে শিখব, নিজের গুনাহের জন্য অশ্রু ফেলব এবং আল্লাহর কাছে আন্তরিক তওবা করব। কারণ আদর্শের সবচেয়ে শক্তিশালী ভাষণ মুখের কথায় নয়, চরিত্রের মধ্যেই প্রকাশ পায়।
– আব্দুর রহিম খান, গণমাধ্যম কর্মী
